মেজর সিনহা হত্যা কান্ড পরিকল্পিত

দিদারুল আলম সিকদার, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি: গতকাল টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশকে আদালতে হাজির করা হয়। *এজলাসের এক কোণায় চিন্তিত ও বিমর্ষ অবস্থায় ছিলেন প্রদীপ *লিয়াকত গুলি করেন এবং প্রদীপের লাথিতে নিস্তেজ হয় সিনহা *লিয়াকত ও নন্দ দুলালের সক্রিয় ভূমিকা প্রমাণিত।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার ৩শ’ পৃষ্টার রায়টি দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল রায় ঘোষনার আগে পর্যবেক্ষণ করেন।

এসময় বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘আমি মেজর সিনহা হত্যা মামলাটি বিভিন ইস্যু খুঁটিনাটি খোঁজার চেষ্টা করেছি। এতে এপিবিএন ৩জন সদস্য দায়িত্বে  ছিলেন। এ তিনজনই প্রথমে সিনহার গাড়িটি আটকানোর পর ছেড়ে দিলেও পুলিশ কি কারণে পুনরায় আটকালেন এবং ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে গুলি করা হয়। এতে প্রমাণিত হয় সিনহা হত্যা একটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড।

বিচরকের পর্যবেক্ষনে উঠে আসে সিনহার সহযোগি সাহেদুল ইসলাম সিফাতের স্বাক্ষ্যের বিবরণীতে ৪ রাউন্ড গুলি করে লিয়াকত আলী। এছাড়াও লিয়াকতের জবানবন্দিতে ওসি প্রদীপ সিনহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন। সিনহার হাতে পিস্তল আছে ভেবে লিয়াকত গুলি করার কথা স্বীকার করেছেন। শেষ পর্যন্ত ওসি প্রদীপ ঘটনাস্থলে পৌছে সিনহার বামপাশে লাথি মারেন এবং সিনহা নিস্তেজ হয়ে যান।

একইভাবে এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতের জবানবন্দিতেও লিয়াকত আগে থেকে সিলভার কালারের গাড়ী থামাতে বলেন এবং তাকে সাথে চেকপোস্টে আসেন। পরে দুই হাত উচু করে সিনহা সামনের দিকে ঝুকে ছিলেন। সে সময় লিয়াকত ৪ রাউন্ড গুলি করে। প্রদীপ ঘটনাস্থলে এসে বলেন, অনেক কষ্টের পর তোকে পেয়েছি। এরপর বুকে বাম পাশে লাথি মারেন এবং সিনহা নিস্তেজ হয়ে যান।

ওসি প্রদীপের ভয়ে জব্দ তালিকা তৈরী করি। মুলত ওসি প্রদীপ যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন আমি সেভাবে করেছি। এতে করে হত্যায় ঘটনাস্থলে লিয়াকত, নন্দ দুলাল সক্রিয় ভূমিকা রাখার প্রমানিত হয়। এছাড়াও মাইকে ঘোষণা দিয়ে সিনহাকে ডাকাত সন্দেহে গণপিঠুনি দিয়ে হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসাবে পুলিশের সোর্স নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আয়াজ ও নিজাম উদ্দিনকে ৫ লাখ টাকার দেয়ার কথা থাকলেও ওসি প্রদীপ তা দেয়নি।

দুপুর ২টার দিকে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ আসামির উপস্থিতিতে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইসমাইল রায় পড়া শুরু করেন। শেষ করেন ৪ টা ২৫ মিনিটে। এ সময় এজলাসের এক কোণায় চিন্তিত ও বিমর্ষ অবস্থায় ওসি প্রদীপকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, সিনহা হত্যা মামলার রায়কে ঘিরে সকাল থেকেই কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গণে ছিল কড়া নিরাপত্তা। খুব সকালে আদালতে পৌঁছানোর পর প্রধান ফটক থেকে শুরু করে এজলাস পর্যন্ত যেতে কয়েক দফা নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিবন্ধকতা পার হতে হয়।

ঢাকার বাইরে কোনও মামলার রায়ের জন্য এমন কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশ বিরল। এ ধরনের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্প্রতি শুধুমাত্র ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের সময়েই দেখা গিয়েছে।

বিচারক আসার বেশ আগেই এজলাসকক্ষ গমগম করছিল সাংবাদিক এবং আইনজীবীদের উপস্থিতিতে। স্থানীয় সাংবাদিকদের বাইরেও ঢাকা থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের কর্মীরা কক্সবাজার আদালতে এসে উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে গত বছর ২৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সর্বশেষ দুই আসামির পক্ষে তাদের আইনজীবীদের যুক্তি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শেষ হয়। পরে বিচারক ৩১ জানুয়ারি রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন।  হত্যাকাণ্ডের আঠারো মাস পর এ মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। যার জন্য প্রয়োজন হয়েছে ২৯ কার্যদিবস।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়ার শামলাপুরে এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে তিনটি (টেকনাফে দুটি, রামুতে একটি) মামলা করেছিল।

সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া সিনহা ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণ বিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য সেসময় প্রায় একমাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। ওই কাজে তার সঙ্গে ছিলেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষার্থী সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা দেবনাথ।

তবে কক্সবাজারের পুলিশ সে-সময় বলেছিল, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেক পোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। ঘটনার পাঁচ দিন পর অর্থাৎ ৫ আগস্ট কক্সবাজার আদালতে টেকনাফ থানার বহিষ্কৃত ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস।

আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে র‌্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্ত শেষে র‌্যাব ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।