মেজর সিনহা কেনো টার্গেট হলেন?

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কক্সবাজারে নিহত হন সেনাবাহিনী থেকে সেচ্ছায় অবসরে যাওয়া মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। যিনি একসময় প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফেও কাজ করেছেন। এই মৃত্যু জন্ম দেয় নানা প্রশ্নের। এরম্যধ্যে সবচেয়ে বেশী যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো মেজর সিনহা কেনো টার্গেট হলেন?

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভে এপিবিএন চেকপোস্টে কেনো বন্দুক যুদ্ধের কবলে পড়তে হলো মেজর সিনহাকে, তার একটি চিত্র উঠে এসেছে এ মামলার অভিযোগপত্রে। অভিযোগপত্রটি প্রস্তুত করেন র‌্যাবের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মাদক নির্মূলের নামে টেকনাফ থানায় নিরীহ মানুষের উপর ওসি প্রদীপ কুমার দাশের অবর্ণনীয় নির্যাতন-নিপীড়নের কাহিনী জেনে গিয়েছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহা ও তার সঙ্গীরা।

এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা সম্পর্কে প্রদীপের অত্যাচারের শিকার কিছু মানুষের সাক্ষাতকারও নিয়েছিলেন সিনহা ও তার সঙ্গীরা। বিষয়টি নিয়ে প্রদীপের সঙ্গেও সিনহা এবং তার সঙ্গী শিপ্রা দেবনাথ ও সাহেদুল ইসলাম সিফাতের কথাও হয়। এরপর বিপদ আঁচ করতে পেরে সিনহা ও তার দলকে ধ্বংস করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন প্রদীপ। তার পরিকল্পনাতেই চেকপোস্টে হত্যা করা হয় সিনহাকে।

আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের একদিন পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। পুলিশের বিরুদ্ধে ‘বিচার বহির্ভূত হত্যার’ অভিযোগগুলো এসময় আলোচনায় আসতে থাকে। গ্রেপ্তার হওয়ার ১০ দিন পর জামিনে মুক্তি পান সিনহার সঙ্গে কক্সবাজারে শুটিং করতে যাওয়া ‘জাস্ট গো’ টিমের সদস্য শিপ্রা ও সিফাত। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের দায়ের করা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে র‌্যাব জানায়, অভিযোগের কোনো সত্যতা তারা পায়নি।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাড়ে চার মাস পর ২০২০ সালের ১৩ ডিসেম্বর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ১৫ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে বলা হয়, সিনহা হত্যার ঘটনাটিকে গোপন রেখে পরিচয় আরো নিশ্চিত হয়ে হত্যার ঘটনাকে ধামাপাচা দেওয়ার জন্য মেজর (অব.) সিনহা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে পর পর তিনটি সাজানো ও বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে উঠে আসে ওসি প্রতিদের নানা অপকর্মের চিত্র। সেখানে বলা হয়, টেকনাফ থানায় ওসি প্রদীপের ৩৩ মাসের সময়কালে ১০৬টি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭৪ ব্যক্তি নিহত হন। অথচ ওই কাজের জন্যই ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বাংলাদেশ পুলিশ মেডাল বা বিপিএম পেয়েছিলেন ওসি প্রদীপ। পদকপ্রাপ্তির সাইটেশনে তার ছয়টি ‘ক্রসফায়ারের ঘটনার উল্লেখ ছিল।

এদিকে এই হত্যাকাণ্ডের পর ঢেলে সাজানো হয় কক্সবাজার জেলা পুলিশকে। এরপর পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর টেকনাফ থানায় যোগ দেন প্রদীপ। তার আগে তিনি একই জেলার মহেশখালী উপজেলার ওসি ছিলেন। টেকনাফে আসার পর থেকেই তিনি মাদক নির্মূলের আড়ালে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ইয়াবা ব্যবসায়ী ছাড়াও স্থানীয় মোটামুটি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নিরীহ পরিবারকে টার্গেট করে, তাদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে, অনেককে ‘ক্রসফায়ারে দিয়ে এবং ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের নির্মম নেশা পেয়ে বসে তাকে।

পুলিশের ওই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ রয়েছে, প্রদীপের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। যারাই চেষ্টা করতেন, তাদেরই প্রদীপের রোষানলে পড়তে হয়েছে। ক্রসফায়ারের ভয়ভীতি প্রদর্শন, বাড়িঘর হতে উচ্ছেদ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগসহ সম্পত্তি বেদখল করে এবং ভয় দেখিয়ে মামলা প্রতি লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে আদায় করাই তার (প্রদীপ) নেশা ও পেশা ছিল বলে তদন্তে জানায় যায়। এই কাজ করার জন্য তিনি তার সমমনা পুলিশ সদস্যদের দ্বারা নিজস্ব একটি পেটোয়া ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলেন।

এরআগে, সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য ওই বছরের ৩ জুলাই কক্সবাজারে যান। ৭ জুলাই তারা হিমছড়ির নিলিমা রিসোর্টের একটি কটেজে ওঠেন। টেকনাফে ওই কাজ করতে গিয়ে লোকমুখে ওসি প্রদীপের অত্যাচার-নিপীড়নের কথা জানতে পারেন সিনহা। অনেক ভিকটিম পরিবারের সদস্যরা সিনহা ও তার ভিডিও টিমের কাছে ওসির অত্যাচারের কাহিনী বলেন।

এরপর ওসি প্রদীপ ও পরিদর্শক লিয়াকতের পেটোয়া বাহিনীর নাম সংগ্রহ শুরু করেন সিনহা ও তার সঙ্গীরা। ক্যামেরাসহ জুলাই মাসে ওসি প্রদীপের সঙ্গে সিনহা ও তার দলের দেখা হয়।

তারা ওসি প্রদীপের সঙ্গে তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন। ওসি প্রদীপ তখনই তাদের ওই কাজ বাদ দিতে ‘হুমকি দেন’ এবং ভিডিও দলটির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

তবে বিষয়টি হালকাভাবে নিয়ে সিনহা তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। তাতে ওসি প্রদীপের সন্দেহ হয় যে, সিনহা সেনাবাহিনীর সাবেক অফিসার পরিচয় দিয়ে পুলিশের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত ভিকটিম পরিবারের সাথে গোপনে যোগাযোগ করছেন। বিষয়টি নিয়ে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইন্সপেক্টর লিয়াকত এবং সোর্স নরুল আমিন, আইয়াজ ও নিজাম উদ্দিনের সাথে কথা বলেন প্রদীপ। তাদেরকে সিনহা সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করতে বলেন।

সে সময় ‘ক্রসফায়ারের শিকার’ কয়েকটি পরিবারে গিয়ে সিনহার ভিডিও টিমের সঙ্গে কথা না বলার জন্যও হুমকি দিয়ে আসে পুলিশ। টেকনাফের হাম জালাল (৫০), আলী আকবর (৪৪), ছেনোয়ারা বেগমসহ (২৪) অন্তত পাঁচটি পরিবারের কাছে সে সময় পুলিশ গিয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩১ জুলাই দুপুরে রামু সেনানিবাসে একটি বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানে ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতের দেখা হয়। তখন লিয়াকতকে সিনহার ভিডিও দল সম্পর্কে সাবধান করেন ওসি, এ বিষয়ে ফোন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

চার্জশিটে বলা হয়, ভয়ভীতি দেখিয়ে ও হুমকি দিয়ে সিনহা ও তার দলকে টলাতে না পেরে নীলনকশা অনুযায়ী সেই রাতে প্রথমে ডাকাত সাজিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন পুলিশের সোর্স নুরুল আমিন, আইয়াজ ও নিজাম উদ্দিন। তাতে ব্যর্থ হয়ে বাহারছড়া চেকপোস্টে আর দশটা ক্রসফায়ারের মত সম্পূর্ণ ঠাণ্ডা মাথায় সিনহাকে গুলি করে হত্যা করেন লিয়াকত। সিনহা গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় ওসি প্রদীপ ও ইন্সপেক্টর লিয়াকত তাকে পা দিয়ে আঘাত করেন, তার গলায় পা চেপে ধরে আনুমানিক সোয়া ঘণ্টা ফেলে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পরিদর্শক লিয়াকত আলী বলেছিলেন, ওসি প্রদীপ তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ওই গ্রুপটিকে সুবিধামত পেলে জানে শেষ করে দিতে হবে। ঘটনার রাতে সিনহাকে চার রাউন্ড গুলি করার বিষয়টি ওসিকে জানালে তিনি সিনহাকে হাসপাতালে পাঠাতে নিষেধ করেন এবং অপেক্ষা করতে বলেন।

তদন্ত কর্মকর্তা তার অভিযোগপত্রে বলেছেন, মামলার প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ, আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের দেওয়া জবানবন্দি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, সিনহা হত্যাকাণ্ড ‘পূর্বপরিকল্পিত’।