বন্ধুত্বের মান-অভিমান

মো.শরীফ উদ্দিন                                                                                                            বন্ধুত্বের মাঝে ভুল-বোঝাবুঝি, ঝগড়া, রাগ বা মান অভিমান থাকবে, তবে তা পুষে রাখা ঠিক নয়। দীর্ঘদিন পুষে রাখলে সকল সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যায় জঘন্য শত্রু। একবার দূরত্ব তৈরি হলে পরবর্তী সময়ে সম্পর্ক ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত আর একেবারেই অপরিচিত হয়ে যায়। তবে এমনটা উভয়ের জন্য কল্যাণ কর নয়। আর তা কখনো সত্যিকারের বন্ধুত্বের পরিচয় নয়। সত্যিকারের বন্ধুত্ব হল মান-অভিমান কে হাওয়ায় ভাসিয়ে বন্ধুত্বের বন্ধনে টিকিয়ে রাখা। মানুষ চিরদিন বেচে থাকেনা সত্যি,তবে ইচ্ছে করলে বন্ধুত্বের বন্ধনে বেচে থাকতে পারে আজীবন। তাই দীর্ঘদিন বন্ধুদের মাঝে যোগাযোগ না থাকলে বন্ধনের যেসব সংকট সমূহ তা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চেষ্টা করলাম।

কল দিলাম ঘনিষ্ঠ জনকে। আর সে হলো আমার ছোট বেলার স্কুল জীবনের বেষ্ট বন্ধু সাইফুল্লাহ। সে এসি আই কোম্পানীর স্বনামধন্য অফিসার। এসিযুক্ত গাড়িতে চলাফেরা, থাকে ঢাকায়। তার সঙ্গে কথা হয় ফোনে। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে ছোট বেলায় তার সঙ্গে মিশেছি। একসাথে হাত ধরে স্কুলে যাওয়া আসা, ক্লাসে একসাথে বসা, টিফিনে ভাগাভাগি করে খাওয়া। হাতে হাত ধরে চলা থেকে শুরু করে বাথরুম পর্যন্ত একসাথে এরারুট গামের মতোই লেগে থাকার বন্ধু সাইফুল্লাহ। হঠাৎ ফোনে আপনি বলে সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করেছে সে। কেন সে তুই করে কথা শুরু না করে আপনি আপনি বলে কথা বলতেছে!!! ভাবলাম দীর্ঘদিন তার সাথে যোগাযোগ না করার কারনে সে হয়তো অভিমান করেছে। সত্যি তাই।

বন্ধু বিপুলকে কল দিলাম। সে ক্লাসের রোল ১ ফাস্ট বয়। বর্তমানে একটা প্রাইভেট হাসপাতালে আছে। সেও তাই আপনি আপনি শুরু করলো। কি ব্যাপার বলতো! তুইও আমাকে আপনি আপনি করছিস কেন? এ কথা সে কথা বলার পর সে নিজ থেকে বলতে শুরু করল তুইতো আগের মতই আছিস। অনেক দিন যোগাযোগ না থাকার কারণে হয়ত তুই রাগ করবি আমার ধারণা হয়েছে বদলে গেছিস। এখনতো দেখছি তুই বন্ধু আগের মতোই আছিস।

মাসেজ্জারে সেটিং হয় কৈশোর কালের বন্ধু শহীদুল্লাহ সুমনের সাথে। স্কুলে একে অন্যকে মামু বলে ডাকতাম। ক্লাসে মামু বাগিনার অন্তরঙ্গ আলাপন ছিল খুবই মধুর। মামির অবস্থা জানতে একসময় আত্মহারা হয়ে মাতোহারায় মেতেছি আমরা। বর্তমানে সে প্রাইভেট কোম্পানির নিউ ভিশন গ্রুপের একাউন্টেন্ট, থাকে ঢাকায়। এখন মাঝে মধ্যে ফেসবুকে-মেসেঞ্জারে সেটিং হয় আপনা-আপনি করে, কথা বলার তেমন একটা সুযোগ হয়না। তবে তার অভিমান দীর্ঘদিন পরে যোগাযোগ, হঠাৎ অনলাইনে আসা ম্যাসেজের উত্তর না দিয়ে আবার উদাও হয়ে যাওয়া। আমার প্রতি তার অনেক বেশি অভিমান আর খোচাও মেরে সেটিং করার কথাগুলো উঠে আসে।

এবার কথা বললাম, স্কুল জীবনের বন্ধু ওয়াহিদ। সে থাকে কোরিয়াতে। ঢাকায় বাড়ী গাড়ী করেছে। প্রায় ২০ বছর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। আজ কথা হচ্ছে ফোনে। সে আমার কণ্ঠ শুনে, পরিচয় দেয়ার পরও চিনতে পারছে না। ছোট কালের কয়েকটি স্মৃতির কথা তাকে বলার পর সে বলে উঠে আপনার কন্ঠ শুনে বুঝতে পারচ্ছি না! আপনি কি আমার সেই “শ” বন্ধু? নাম্বার সেফ করে তোকে ইমোতে ভিডিও কল দিয়ে বিশ্বাস করাছি। তখন সে বলে অনেক পরিবর্তন হয়েছে আপনার কন্ঠে। চেনার পর কেন আপনি আপনি করছিস! তুই খুব আন্তরিকতার সঙ্গে এক সময় আমার সাথে তুই তাই করে কথা বলছিস। এখন কেন আপনি আপনি করছিস? তুই করে আমার সাথে কথা যদি বলিস তখন তোর সাথে কথা বলবো।

ঠিক আছে পরে কল দিবে বলে রেখে দেয় ফোন। অভাগ হয়ে গেলাম, কিছুই বুঝলাম না!। এমন কি পরিবর্তন হয়েছে আমার। বন্ধুরা আমার সাথে এমন ভাব নিলো কেন? বন্ধুদের কাছ থেকে এমন আচারন (ভাল কিছু নয়) সৌভনীয় নয়।

পরে একে একে বন্ধু সবাইকে ফোন করতে লাগলাম। ক্লাসমেট প্রায় সব বন্ধুরা কেন আমার সাথে এমন আপনি আপনি করে কথা বলছে! স্কুল জীবনের ছোট বেলার বন্ধুরা আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করছে শুনে নিজেকে বেশ ছোট মনে হচ্ছিল।

তাই পরাণ বন্ধুদের বলি ঘনিষ্ট বন্ধুরা পরস্পরকে তুই বলে ডাকে। যে কোনো মর্যাদার দিক থেকে “বন্ধু” যত বড় হোক না কেন, বন্ধুত্বের মাঝে তুই সম্পর্ক না থাকলে কেমন যেন দূরত্ব দূরত্ব (লবন ছাড়া তরকারি) মনে হয়। তুই বললে একে অন্যকে কাছের আরো বেশি আপন মনে হয়। এ জন্যই প্রকৃত বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিজের জীবন থেকে মূল্যবান হয়ে উঠে।

কথা হয় রঙ্গ রসের বন্ধু এডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন শাহিনের সাথে। সে থাকে নোয়াখালী মাইজদি শহরে। বর্তমানে তাকে খুব চঞ্চল মনে হচ্ছে। তার সাথে কথোপকথনে স্কুল জীবনে বন্ধুত্ব, আবেগ, খুনসুটি, মান অভিমানের কথাগুলো উঠে আসে। সকল সম্পর্কের আগে সম্মান না থাকলে কোন সম্পর্কই স্থায়ী বা টেকসই হয়না। সম্মানের জায়গায় থেকে পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে আপনি বা তুই বলা দোষের কিছু নয়। এডভোকেট সাহেব কি মনে করেন? তখন সে বলে তাইতো আমি আপনিতে আপন খুঁজে পাই।

হঠাৎ করে ওয়াহিদের ফোন আসলো। নিজ থেকে বলতে শুরু করল তুইতো আগের মতোই আছিস। আমি শুধুশুধু তোর সাথে জগড়া করতেছি। অনেক দিন যোগাযোগ না থাকায় ধারণা হয়েছে তুই বদলে গেছিস। এখনতো দেখছি তুই বন্ধু ঠিকই আছিস।

অবশেষে বন্ধুরা স্বীকার করতে বাধ্য হলো আমি কেন তাদেরকে না জানিয়ে প্রবাসে গেলাম এবং দীর্ঘ সময় যোগাযোগ করলাম না কেন? তাই প্রায় সব বন্ধুরা রাগ করেছে। মান অভিমানের কথাগুলো সবার কাছ থেকে উঠে এসেছে। তাই বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট রাখতে বন্ধুদের নিয়ে করনীয় দিকগুলো নিচের লিংকে দেয়া হয়েছে।

লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আরো পড়ুন- বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট থাকুক আজীবন