পরিবহন ধর্মঘটঃ চট্টগ্রাম বন্দরে স্থবিরতা, কনটেইনার জটের শঙ্কা

পরিবহন ধর্মঘটঃ চট্টগ্রাম বন্দরে স্থবিরতা, কনটেইনার জটের শঙ্কা

জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহারের দাবিতে অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘটে গণপরিবহনের পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী গাড়ি চলাচলও। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। জাহাজে কনটেইনার খালাস ও বোঝাই স্বাভাবিক থাকলেও পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এখানকার ১৯টি আইসিডিতেও বন্ধ রয়েছে পণ্য পরিবহন। এতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, বন্দরে পণ্য পরিবহন বন্ধ থাকলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে।

এদিকে পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন চট্টগ্রামের মানুষ। অভ্যন্তরীণ গণপরিবহন সার্ভিসের পাশাপাশি চলছে না দূরপাল্লার বাসও। তেলের বর্ধিত দাম প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা। গণপরিবহন বন্ধ থাকার সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে ছোট ছোট যানবাহনগুলো।

জ্বালানি তেল ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করায় বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন পরিবহন মালিকেরা। এই সময়ে তেলে দাম না কমায় শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ধর্মঘট পালন শুরু করেছে সব ধরনের গণপরিবহন ও পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ডভ্যান। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, তেলের দাম বাড়ানোর ফলে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। ব্যয় মিটিয়ে আয় করা সম্ভব হবে না। এ কারণে বিদ্যমান ভাড়ায় গাড়ি চালাতে চাইছেন না তারা।

তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মবিরতির মাধ্যমে ধর্মঘট পালন করছে বাংলাদেশ কাভার্ডভ্যান-ট্রাক-প্রাইমমুভার পণ্য পরিবহন মালিক সমিতি। এই ধর্মঘটের কারণে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান চলাচল করছে না। শুক্রবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন নিমতলাসহ আশপাশের এলাকায় ট্রাক-কাভার্ডভ্যানগুলোকে অলস অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল থেকেই আমদানি করা পণ্য ডেলিভারি নিতে কোনো ট্রাক-কার্ভাড ভ্যান ও লরি বন্দরে ঢুকতে পারেনি। তেমনি বন্দরের ভেতর থেকেও পণ্য নিয়ে কোন গাড়ি বের হতে পারেনি।

শুক্রবার (৫ নভেম্বর) সকাল থেকে পরিবহন ধর্মঘট শুরুর পর চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি, ইয়ার্ড ও অফডকে (ডিপো) স্বাভাবিক ডেলিভারিতে ছন্দপতন ঘটে।

চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি, সিসিটি’র অপারেশনের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা জানান, জেটি, ইয়ার্ড ও টার্মিনালের অভ্যন্তরীণ কর্মযজ্ঞ স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। জেটির জাহাজগুলোর লোড-আনলোড স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আমদানি পণ্য ডেলিভারি ৫ শতাংশে ঠেকেছে। অনেক ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি পণ্য বা কনটেইনার বোঝাই করে অপেক্ষা করেছে ধর্মঘট প্রত্যাহার করলেই বন্দর ছাড়ার আশায়।

বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হলে নেতিবাচক প্রভাব তো পড়বে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে প্রতিদিন ১৯টি অফডক থেকে যে সাড়ে ৪ হাজার কনটেইনারবাহী গাড়ি বন্দরে চলাচল করত তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার বিভিন্ন কারখানা থেকে রফতানি পণ্য নিয়ে যেসব ট্রাক-কাভার্ডভ্যান অফডকে আসত তা-ও আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। এ ধর্মঘট যত দ্রুত প্রত্যাহার হবে ততই বন্দর, অফডক তথা অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।

তিনি জানান, অফডকগুলোতে এখন ৯ হাজার রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনার, ৮ হাজার আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার এবং ৩৩ হাজার খালি কনটেইনার রয়েছে। ধর্মঘটের কারণে রফতানিপণ্য কিংবা খালি কনটেইনার জাহাজীকরণে সমস্যা হয়েছে কিনা কয়েকদিনের মধ্যে জানা যাবে।

বন্দরের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৪ নভেম্বর) সকাল আটটায় চট্টগ্রাম বন্দরের মেইন জেটিতে ৬টি কনটেইনার জাহাজ, ৩টি সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ, ১টি খাদ্যশস্যাবাহী ও ২টি সিমেন্ট ক্লিংকারবাহী জাহাজ ছিল। এ সময় বহির্নোঙরে ৬৫টি জাহাজের মধ্যে আনলোড হয়েছে খাদ্যশস্যবাহী ৯টি, সাধারণ পণ্যের ৮টি, সারের ২টি, ক্লিংকারের ২০টি, চিনির ২টি ও তেলের ৩টি জাহাজে। বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজের মধ্যে কনটেইনারবাহী ছিল ৩টি। ওই দিন ২০ ফুট দীর্ঘ (টিইইউ’স) ৪৯ হাজার ১৮টি কনটেইনরা ধারণক্ষমতার বিপরীতে বন্দরে কনটেইনার ছিল ৩৭ হাজার ৭৩৮টি। ২৪ ঘণ্টায় ডেলিভারি হয়েছিল ৪ হাজার ৩৪টি।

চট্টগ্রাম বন্দর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহুর আহমদ বলেন, প্রতিদিন ৫-৬ হাজার ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ঢুকে বন্দরে। জাহাজ বেশি ভিড়লে আরও বেশি পণ্যবাহী গাড়ির প্রয়োজন হয়। ধর্মঘটের কারণে ট্রাকগুলো অলস বসে আছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম আকতার হোসেন বলেন, বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড, শেড, টার্মিনাল ও ডিপোতে শুল্ক পরিশোধ, কায়িক পরীক্ষাসহ খালাসের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেও হাজার হাজার গাড়ি অলস বসে আছে ধর্মঘটের কারণে। ধর্মঘট দীর্ঘায়িত হলে আমদানি-রফতানিকারক, বন্দর ব্যবহারকারী, শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এটা নিয়ে সংশ্লিষ্টরা উদ্বিগ্ন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান সন্ধ্যায় বলেন, বন্দরের জেটি, ইয়ার্ড, টার্মিনাল, ডিপোতে কার্গো ও কনটেইনার লোড আনলোড স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। আন্তঃজেলা পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল না করায় ডেলিভারি সাইডে সমস্যা হচ্ছে। বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান, চেম্বার, বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা সুষ্ঠু সমাধানের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।