নারীর প্রতি নির্যাতন বন্ধে চাই মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন

উম্মে ফারুয়া

সুমির বয়স এখন ৩৫ বছর। ১০ বছর আগে এইচএসসি পড়ার সময় বিয়ে হয় সুমির। ভালো পরিবার ও ভালো ছেলে দেখে মা-বাবা তার বিয়ে দেন। বিয়ের পর দুই বছর বেশ ভালোই চলল সংসার। বছর না ঘুরতেই ছেলে সন্তানের মা হয় সুমি। এরপর তার স্বামীর আসল চেহারা একটু একটু করে প্রকাশ পেতে থাকে। বিভিন্ন অজুহাতে স্বামী তাকে হেনস্তা করে। সংসারে তার মতামতের কোনো মূল্য নেই। একদিন ব্যাবসা করবে বলে স্বামী সুমিকে বাবার বাড়ি থেকে এক লাখ টাকা এনে দিতে বলে। প্রথমে বাবার কাছ থেকে সে টাকা এনে দেয়। কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার টাকা চায়। বাবার আর্থিক অবস্থা জানে সুমি, তাই সে তার স্বামীকে টাকা দিতে পারবে না বলে জানায়। এরপর থেকেই শুরু হয় তার উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। সন্তানের কথা ভেবে প্রথমে নির্যাতন সহ্য করে সুমি। এক সময়ে সুমির ধৈর্য্যের বাধঁ ভেঙ্গে যায়। বের হয়ে আসে স্বামীর ঘর থেকে। বাবার বাড়ি হয় তার আশ্রয়। হতাশা আর দু:শ্চিন্তা ভেঙ্গে পড়ে সে। কিন্তু বাবার প্রেরণায় মনোবল ফিরে পায় সে। বাবার পরামর্শে সেলাই প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গিয়ে সেলাই কাজ শেখা শুরু করে। প্রথমে বাড়িতে বসে সেলাই কাজ শুরু করে, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নানাকাজের ফোরমাশ পেতে থাকে। ব্যাবসা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। টাকা জমিয়ে সে একটি দোকান ভাড়া নেয়। আজ সে একটি টেইলারিং দোকানের মালিক। সে শুধু নিজের ভাগ্যই পরিবর্তন করেনি, অনেক মেয়ের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করেছে। সুমির মত অনেক নারী আমাদের সমাজে এই ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে অনেকে নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হয়েছে। কিন্তু অনেক মেয়েই তা পারে না।

আন্তর্জাতিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতাকে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়েছে। কেন না নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু নারীর অধিকারকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং মানবতা, অর্থনীতি, সমাজসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বাধাঁগ্রস্ত করে। নারীর প্রতি সহিংসতার কারণ দেশ কাল পাত্র ভেদে বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তাই এর প্রতিকারও করতে হবে সংস্কৃতি ও মানসিকতার অবস্থাকে লক্ষ্যে রেখে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সহিংসতার সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে- কোনো প্রকার কাজ বা আচরণ যার ফলে নারী শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা এ ধরনের ক্ষতি ধারণের জন্য হুমকি দিলে, নারীর স্বাধীনতা খর্ব করলে, স্বাধীন মনোবৃত্তির বিকাশ থেকে বঞ্চত করলে তাকে নির্যাতিত বা সহিংসতা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। নারীর নির্যাতন শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বজুড়েই নারীর প্রতি সহিংসতা রয়েছে। তবে অনুন্নত, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর মাত্রা অনেক বেশি। এখনো বিশ্বে প্রতি তিনজন নারীর মধ্যে একজন শারীরিক, মানসিকসহ নানাধরনের নির্যাতনের শিকার হন। নারীর প্রতি সহিংসতা তার মর্যাদাকে হেয় করে, তেমনি এক পর্যায়ে নারী নিজেকেও দোষী ও ছোটো ভাবতে শুরু করে। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ শুধু মেয়েদের কল্যাণের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এবং জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য জরুরি। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী পুরুষের সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে এবং দেশের বিদ্যমান আইন, নীতি ও কৌশলেও নারী পুরুষের সমতার কথা উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, দুর্বলতা, দারিদ্র্য ও বাসস্থানের অভাব এবং সহিংসতা প্রতিরোধ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যেগের অভাব। দক্ষিণ এশিয়া নারীর উপর পারিবারিক নির্যাতনকে খুব সাধারণ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়। ফলে বর্তমানে তা সহিংসতার আকার ধারণ করছে। যৌতুকের জন্য নারীর উপর নির্যাতন; বাল্যবিয়েতে বাধ্য করা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি এবং চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করাসহ; স্বামী, শাশুড়ী ও পরিবারের অন্যদের নারীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা; শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাসহ আরো নানাভাবে নারীরা নির্যাতিত হয়ে থাকে। গৃহ, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমল, অফিস এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে না। শিক্ষিত অশিক্ষিত অধিকাংশ নারীই কোনো না কোনোভাবেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। নির্যাতনের পরিণতি হচ্ছে পঙ্গুত্ব, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, লজ্জা ও অপমানে আত্মহত্যা, সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়া, অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, অনেক ক্ষেত্রে চরম পরিণতি মৃত্যু। করোনা অতিমারির সময়ে নারী ও শিশু সহিংসতা থেকে রেহাই পাইনি। আগে যে কোনো বছরের চেয়ে করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে সহিংসতার পরিমাণ রেড়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতা। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়াও দেশে গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের তুলনায় চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এবং রাহাজানির ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। গত ২২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মনিত্রসভার বৈঠকে এই প্রতিবেদন উত্থাপন করা হয়। নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ বিবাহিত নারী তাদের জীবনে স্বামীর দ্বারা এক বা একাধিক ধরনের সহিংতার শিকার হন। ৪৯ দশমিক ৬ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এই নারীদের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশ আইনগত পদক্ষেপ নিয়েছেন। অনেক নারী এখনো মনে করেন যে স্বামী স্ত্রীকে মারধর করতে পারে । সহিংসতার শিকার বেশিরভাগ নারী ও কিশোরী ঝামেলা এবং লোকলজ্জার ভয়ে কোনে ধরনের আইনি সহায়তা নিতে চান না। বাংলাদেশে স্বামী নির্যাতনের কারণে ৭ দশমিক ১ শতাংশ নারী আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক বা প্রথাগত

-২-

সামাজিক রীতিনীতির কারণে অনেক সময় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও কিছুটা প্রভাব ফেলে। যেমন: বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, স্ত্রীর বয়স ১৪ বছরের কম হলে বৈবাহিক ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং মহামান্য হাইকোঠের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একাধিক আইন ও বিধি প্রণয়ন করেছে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন প্রণয়ন তার বড়ো উদাহরণ। বাংলাদেশ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ (সিডিও) সনদে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট নারী বান্ধব করা হয়েছে। নারী পুরুষের সমতার বিষয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সংস্থা ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর উইমেন্স এন্ড চিলড্রেনস ডেভেলপমেন্টের চেয়্যারমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর সহায়তায় বিভাগীয় শহরে মহিলা সহায়তা কেন্দ্র চালু রয়েছে। এ কেন্দ্রে নির্যাতনের শিকার নারীদের আশ্রয়, বিনাখরচে আইনগত পরামর্শ ও মামলা পরিচালনার জন্য সহায়তা দেওয়া হয়। ৭টি বিভাগীয় শহরসহ ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে ও এর মাধ্যমে একই জায়গা থেকে সমন্বিনিতভাবে চিকিৎসা সেবা, আইনগত সেবা, পুলিশি সহায়তা, আশ্রয় ও পুর্ণবাসনের ব্যবস্থা করা হয়। ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারীকে মনোসামাজিক কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ন্যাশনাল হেল্প লাইন সেন্টারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী, শিশু বা তার আত্নীয়- স্বজনের সাথে কথা বলে তার সমস্যা প্রসঙ্গে জানার চেষ্টা করা হয় এবং নির্যাতনের ধরন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে পরামর্শ প্রদান করা হয়। দেশের ৪০টি জেলা ও ২০টি উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত ওয়ান- স্টপ ক্রাইসিস সেল হতে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আশ্রয় কেন্দ্র এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিরাপদ আবাসন, বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের আশ্রয় কেন্দ্র সময়ে নারী ও শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে।

কন্যা, জায়া, না হয় জননী, যে-কোনো নারীর পরিচয়ই এই তিনটি সূত্রে গাঁথা। নিজ গৃহে কিংবা কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। সহকর্মী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী ভাবতে হবে। যেকোনো কাজ বা সিদ্ধান্তের বিষয়ে অবশ্যই নারীর মতামত বিবেচনা করতে হবে। সহিংসতার আকার যেমন হোক না কেন, তা প্রকৃত অর্থে মানবতার জন্য কলঙ্ক। আমাদের প্রত্যাশা, যথার্থ সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি বেসরকারিখাত এবং সুশীল সমাজের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হোক। কেননা সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা সম্ভব বলেই আমরা বিশ্বাস করি। তাই আসুন আমরা সবাই নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সচেতন হই, আমাদের নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।

লেখক- ফ্রিল্যান্সার