রাজাকার পুত্রের হাতে রক্তাক্ত ও লাঞ্চিত মুক্তিযোদ্ধা মানু

এ,জে সুজন কুষ্টিয়া প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অফিসে রাজাকারপুত্র শফিক ও তার পেটোয়া বাহিনীর হাতে রক্তাক্ত লাঞ্ছিত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন মানু।
গত ১১জানুয়ারী রাত ৭টার দিকে লাঞ্চিত হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। উক্ত ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
ঘটনার সূত্রে জানা যায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন মানু’র সরকারি রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত সমবায় সমিতি আছে। যার থেকে সদস্যদের ঋণ প্রদান করা হয়ে থাকে। হামলাকারীরা সমিতি থেকে বেশ কয়েক বছর পূর্বে ঋণ গ্রহণ করে থাকলেও তারা ঋণ পরিশোধ করেননি। যার কারণে তাদের বিরুদ্ধে সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তুলে নেওয়ার জন্য প্রথমে বীর মুক্তিযোদ্ধার ছেলের উপরে হামলা করে তারা। ছেলের উপর হামলা করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে আরো একটি মামলা দায়ের করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন মানু। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা চলমান। মামলা দুটি তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি ধামকি দেওয়ার পরেও কাজ না হওয়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আরো বেশ কয়েকটি চেক জালিয়াতির মামলা রয়েছে বলেও জানা যায়।
মারাত্মক জখমের শিকার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন মানু’র বরাত দিয়ে জানা যায়, গত ১১জানুয়ারী ৬টা ১৩ মিনিটে তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে নিপুন নামের এক ব্যক্তি ফোন দিয়ে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি-ধামকি প্রদান করে। তখন তিনি বলেন- মামলা শেষ পর্যায়ে চলে গেছে এটা এখন সম্ভব না। তখন বিপরীত পাশে থাকা নিপুন তাকে মোবাইলের মধ্যেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। এরপর তিনি বলেন “একজন মুক্তিযোদ্ধা কে তুমি এভাবে বকা বাজির করতে পারো না” বলার পরে ফোনটি কেটে যায়।নিপুন কুমারখালি পৌর আওয়ামী লীগের সাধারাণ সম্পাদক।  তখন বীরমুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন কুমারখালী শহরের গুড় বাজারে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অফিসে গিয়ে উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা এটিএম আবুল মনসুর মজনু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অহিদুর রহমান টগরকে সব খুলে বলেন। তারা বিষয়টি শোনার পর তাকে কুমারখালীর মাননীয় এমপি মহোদয়ের মায়ের সাথে কথা বলতে বলেন। তখন তিনি মোবাইল বের করে এমপি মহোদয়ের মায়ের মোবাইল নম্বরে ফোন দিতে গেলে হঠাৎ পিছন থেকে শফি, রতন, আশরাফ, সুলতান, হারুন সহ অজ্ঞাত বেশ কয়েকজন তাকে জামার কলার ধরে টেনে বের করে নিয়ে বেধড়ক মারতে থাকেন। মারতে মারতে থাকে রাস্তা দিয়ে টেনে-হিঁচড়ে নিপুনের অফিসে নিয়ে যান তারা। সেখানে গিয়ে দেখেন সদকী ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান দীপ ও দ্বীপের বাবা নিপুন সেখানে উপস্থিত আছেন। তখন অফিসের দরজা আটকিয়ে নিয়ে তাকে আবারও বেধড়ক মারধর করা হয়। নিপুন তার মুখে একাধারে ঘুষি মারতে থাকেন। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সরাসরি সাক্ষাৎকারে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন বলেন “আমি মারা গেলেও কারোর সাথে মারামারি করতে চাই না, আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।”
আহত বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে জানান, আমার আব্বা আগে থেকেই হার্টের রোগী। তারপর তার মাথায় এমন ভাবে মারছে যে কোথাও আর বাকি নাই। সারা মাথায় আঘাত করেছে তারা। সেই সাথে তার সারা শরীরে থেঁতলানো মার মেরেছে। আমার আব্বার মাথায় দুইটা সেলাই পড়েছে। আমি এই ঘটনার সর্বোচ্চ বিচার দাবি করছি। একজন মুক্তিযোদ্ধার গায়ে হাত তোলা দুঃখজনক বিষয়।
আহত বীরমুক্তিযোদ্ধার ছেলে আসাদুজ্জামান নয়ন বলেন, এক বছর আগে এই শফি, হারুন, সুলতান সহ তাদের অনুসারীরা তাকে অনেক মার মেরেছে। তার নাকের টিস্যু ও পা ভেঙে দেয় তারা। এমনকি গলায় ফাঁসি দিয়ে হত্যা করারও চেষ্টা করেছিল তারা। যাইহোক কপাল গুনে বেঁচে যাবার পর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছেন তারা। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা এটিএম আবুল মনসুর মজনু জানান, কুমারখালীর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অফিসে আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা পারের সাথে বসে তিনি কথা বলছিলেন। হঠাৎ বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন মানু এসে তাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি ধামকি দেওয়ার বিষয়টি জানান।
তিনি তখন তাকে এমপি সাহেবের মা মমতাজ ভাবির সাথে কথা বলার জন্য বলেন। তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদ হোসেন কথা বলার জন্য মোবাইল ফোনটি বের করলে পেছন থেকে হঠাৎ করে রফিক কমিশনারের ভাই শফি সহ অনেক ছেলেপেলে মিলে তার জামার কলার ধরে “চল নিয়ে যেতে বলেছে” বলে বের করে অনেক মারধোর করে। তারা ঠেকাতে গেলে ওদের সাথে পারিনি। তৎক্ষণাৎ এমপি সাহেবকে তিনি ফোন করে বলেন- মানু আমার অফিসে ছিল। তাকে ওরা মারতে মারতে নিপুনের অফিসের দিকে নিয়ে গেছে। তুমি ওকে বাঁচাও। তখনই এমপি সাহেব ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করে। সে এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
তিনি আরো বলেন- বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে যারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও তারা হামলার শিকার হচ্ছেন। দুঃখের বিষয় যে শফির নেতৃত্বে আজ বীর মুক্তিযোদ্ধার উপর হামলা চালানো হয়েছে সেই শফির বাবা ও দাদা কুমারখালী তালিকাভুক্ত রাজাকার। এটা খুবই লজ্জাজনক। তিনি আশা করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা অহিদুর রহমান টগর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে এভাবে মারা সমীচীন নয়, এটা বড় অন্যায়।
কুষ্টিয়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার রফিকুল আলম টুকু মুঠোফোনে বলেন, অন্যায়কারী যেই হোক না কেন ভয়ের কোন কারণ নেই। তার বিচার হবেই।
বিষয়টি নিয়ে কুমারখালী থানার ওসি তদন্ত আকিবুল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এব্যাপারে কুমারখালি থানায় মামলা দ্বায়ের করা হয়েছে, মামলা নাম্বার ১০।