তিন যুগ চাকরি করার পরও মিলেনি দেড় হাজার গার্ডের পদোন্নতি

জাহাঙ্গীর আলম: জ্যৈষ্ঠতা আর নিয়মিতকরণের গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হয়েছেন দেড় হাজার সিকিউরিটি গার্ড। যথাসময়ে নিয়মিতকরণ না করায় গত তিন যুগেও মিলেনি তাদের পদোন্নতি। দফায় দফায় আবেদন নিবেদন করেও কোন ফল হয়নি।
একই পদে তাদের অনেক পরে যোগদান করেও নিয়মিতকরণের ফলে জ্যৈষ্ঠতা নির্ধারণ হয়েছে অনেকের। ১৯৯৪ সালে সাল ও তার পরবর্তী সময়ে যোগদান করেও তারা সিনিয়র হয়ে গেছেন। এমনকি ২০০৬ ও ২০১৭ সালে যোগদানকারিদের থেকেও পিছিয়ে পড়েছেন তারা।
তাদের নিয়মিতকরণে বন বিভাগের প্রধান অফিস থেকে দেয়া আদেশও কার্যকর করেনি জেলা ও বিভাগীয় অফিসগুলো। দীর্ঘ বছরেও পদোন্নতি না পেয়ে হতাশা ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। অনেকেই ক্ষোভে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর নেয়ার কথাও ভাবছেন।
বাংলাদেশ বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এ আট বছরে অন্তত দুই হাজার ফরেস্ট গার্ড নিয়োগ করা হয়। এদের মধ্যে ৫০০ জনের নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতি পেলেও বাকি ১৫০০ কর্মী এখনো বঞ্চিত রয়ে গেছেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বন বিভাগের বিধি অনুযায়ী নিয়মিতকরণ না হলে পদোন্নতি দেয়া যায় না। এ বিভাবের বিধিমালা অনুযায়ী যোগদানের দুই বছর পরেই নিয়মিতকরণ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া ১৫০০ ফরেস্ট গার্ডকে নিয়মিতকরণে সেই বিধান মানা হয়নি। বিধি অনুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকেই জ্যৈষ্ঠতা নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ ১৫শ ফরেস্ট গার্ডকে যোগদানের তারিখ থেকে অদৃশ্য কারণে জ্যৈষ্ঠতা নির্ধারণও করা হয়নি। এ কারণে তাদের নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতিতে জটিলতা দেখা দেয়।
কর্মরত ফরেস্ট গার্ডের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ বছর চাকরি করার পরও অনেক কর্মচারি চাকুরির শেষ পর্যায়ে এসে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ায় ফরেস্ট গার্ডদের কষ্ট আরো বেড়েছে। পদোন্নতির বিষয়ে ২০১০ ও ২০১৬ সালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পর পর দুটি পত্র জারি করা হলেও বিভাগ ও জেলা পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় তা কার্যকর হয়নি। এটাই অসন্তোষের মূল কারণ বলে মনে করেন বন প্রহরীরা। অথচ অতীতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ বনপ্রহরী কল্যাণ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে তৎকালীন সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক মো. রকিবুল হাসান মুকুল ফরেস্ট গার্ড থেকে ‘ফরেস্টার’ পদে পদোন্নতির জন্য চাকরি বহি ও হালনাগাদ তথ্যাদি প্রেরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিঠি দেন’। চিঠিতে ‘কোনো কর্মচারীর চাকুরি স্থায়ী ও নিয়মিত করা না হয়ে থাকলে চাকুরি স্থায়ী ও নিয়মিত করে চাকুরি বহিতে এন্ট্রি প্রদানপূর্বক হালনাগাদ চাকুরি বহি প্রেরণ করতে’ ওই বছরের ২০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন তিনি। কিন্তু সে নির্দেশনা বিভাগীয় কর্মকর্তারা কার্যকর করেননি।
প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধরী (সিসিএফ) জানান, বন বিভাগে সকল কার্যক্রম বিধিবিধান মেনেই করতে হয়। বিধিমালার বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নাই। নিয়ম মেনে নিয়মিতকরণ ও পদোন্নতি দেয়া হয়। এরই মধ্যে খসড়া তালিকা করা হয়েছে। এতে কেউ সংক্ষুদ্ধ হলে আপিল করতে পারে।
তিনি বলেন, ফরেস্ট গার্ডরাও আমাদের অংশ। তাদের বঞ্চিত করার কোন ইচ্ছা ও সুযোগ নেই। বিধিমালা মেনেই কাজ করা হবে। কেউ বঞ্চিত হবে না।
সূত্র জানায়, বন অধিদপ্তর থেকে একই সাথে দেশের সকল ফরেস্ট গার্ডদের একযোগে একই তারিখে নিয়মিতকরণের জন্য আদেশ জারি হলেও তা মানা হয়নি। ভিন্ন ভিন্ন তারিখে একেক জেলা ও বিভাগ থেকে একেক সময়ে নিয়মিত করণের আদেশ জারি করা হয়। একারণে জটিলতা দেখা দেয় ।
বন অধিদপ্তরের সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক (সংস্থাপন) মো. রাকিবুল হাসান মুকুল ২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল স্বাক্ষরিত এক আদেশে রাজস্বখাতে যোগদানকৃত ফরেস্ট গার্ডদের ওই বছরের ১২ জুন চাকুরি নিয়মিত ও স্থায়ীকরণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়। আদেশে বলা হয়, এ আদেশের ফলে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে কোনো জটিলতা থাকবে না। একই সাথে সারাদেশে ফরেস্ট গার্ডদের একই দিনে নিয়মিতকরণের আদেশ দেয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাতকারণে তা কার্যকর হয়নি।
বন প্রহরীরা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে নতুন প্রকাশকৃত জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তালিকায় যারা ২০০৬ ও ২০১৬ সালে যোগদানকারী তারা তালিকায় প্রথমে রয়েছে। এরপর ১৯৯৪ ও পরবর্তী বিভিন্ন প্রকল্প থেকে আসা ফরেস্ট গার্ডরা রয়েছেন। কিন্তু ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০সাল যোগদানকারী ফরেস্ট গার্ডরা তাদের পেছনে পড়ে গেছে।
ফরেস্ট গার্ডরা জানান,যোগদানের ভিত্তিতে জ্যৈষ্টতা নির্ধারণ ও নিয়মিতকরণ করলে এবং সারাদেশে একই সাথে নিয়মিতকরণ করলে এ জটিলতা সৃষ্টি হত না।
বাংলাদেশ ফরেস্ট গার্ড কল্যাণ সমিতি চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সভাপতি মোস্তফা জামাল উদ্দিন তালুকদার বলেন, পদোন্নতি লাভের নিমিত্তে নিয়মিতকরণে আমাদের অধিকার ছিল এবং আছে। কিন্তু আমাদের অধিকার রক্ষা হয়নি। আমাদের অনেক পরে যোগদান করে অনেক সহকর্মীর নিয়মিতকরণের ফলে তারা জ্যেষ্ঠতা পেয়েছেন। চাকুরির বিধিবিধানে স্বীকৃত পদোন্নতি লাভের অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, চাকুরির পদোন্নতি সমতা ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কর্তৃপক্ষের সদয় বিবেচনার জন্য আপত্তি জানিয়েছি। কোন অসংগতি থাকলে সদস্যদের আবেদন করতে বলেছি।
তিনি বলেন, বিধিবিধান হচ্ছে অধিকার ভোগের রক্ষাকবচ। কোন বিধিবিধানের আলোকে কাউকে যোগদানের তারিখ থেকে আবার কাউকে আদেশ জারির তারিখ থেকে নিয়মিতকরণ করা হল তা বোধগম্য নয়। যার চাকুরি আগে নিয়মিতকরণ করা হয়েছে সে আগে জ্যেষ্ঠতা পেয়েছে। আমাদের যথাসময়ে নিয়মিতকরণ করা হয়নি। কেন করা হয়নি তা জানি না। এখানে বিধিবিধান মানা হয়নি। বিধিবিধান কারো অনুকুলে আর কারো প্রতিকুলে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এক দেশে দুই আইন থাকতে পারে না। বন বিভাগ থেকে ইতিপূর্বে জারি করা,আদেশ বাস্তবায়ন করলে এ জটিলতা সৃষ্টি হত না।
তিনি বলেন, বৈষম্য নিরসনকল্পে আমরা মাননীয় মন্ত্রী,সচিব,প্রধান বন সংরক্ষকমহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট মহলে বার বার আবেদন নিবেদন করেও কোন ফলোদয় হয়নি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,আমাদের গরীবদের এত ক্ষীনকণ্ঠ অত বড় কান পর্যন্ত পৌঁছায়না। তিনি বলেন,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছোট কর্মচারিদের ন্যায্য দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করতে গিয়ে ছাত্রত্ব হারিয়েছিলেন।
তিনি বলেন,জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধে অবদানের কারণে রাজাকার আলবদররা আমাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে দিয়ে আমাদের পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করেছিল। এবার হয়ত ইজ্জতের কারণে চাকুরি ছাড়তে হবে। আশা করও উনার সুযোগ্য কন্যা আমাদের দিকে নজর দিবেন। আমরা এ ব্যাপারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
তিনি বলেন, সিনিয়রদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দিলে চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়বে। বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে। বন প্রহরীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিবে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সময়ে চাকুরিতে যোগদান করে পদোন্নতি না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
নির্ধারিত সময়ে নিয়মিতকরণ ও যোগদানের তারিখ থেকে জ্যৈষ্ঠতা নির্ধারণ না করায় বঞ্চিত হয়েছেন দেড় হাজার বন প্রহরী।