জীবন পরিবর্তনে প্রকৃত ভালো বন্ধু প্রয়োজন

 মো.শরীফ উদ্দিন

“বন্ধু”তিন অক্ষরের ছোট এই শব্দের মাঝে যেন মিশে আছে সহজ সরল অনুভূতি, বিশ্বস্ততা আর নির্ভরতার মায়া। আর এই মায়ার বাঁধন তৈরি হয়েছে স্কুল জীবন থেকে। সেই সময় বন্ধুদের নিয়ে হাঁসি, ঠাট্টা, গল্প, আড্ডা, খেলাধুলা আর গানে গানে কাটেছে সময়। তখন আনন্দময় দিনগুলো নানা আয়োজনে মেতেছি সবাই। এসব সোনা, হিরা, রুপার বন্ধুর মধ্যে দিয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদেরকে নিয়ে জীবন কাটাতে হচ্ছে আমাদের। তবে হ্যাঁ এটা সত্যি, বন্ধুত্ব চলমান একটি প্রক্রিয়া। তাই শিশুকাল থেকে বৃদ্ধাকাল পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহুর্তে বন্ধু তৈরী হতে পারে। মনে রেখ হিরা পেয়ে সোনাকে ভুলে যেও না। কারন বাস্তব জীবনে হিরা ধারন করতে সোনাই লাগবে। আর সেই সোনা বন্ধু হলো স্কুল জীবনের বন্ধু।

এদিকে,বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমাদের ফেসবুকে-মেসেঞ্জারে নানা ধরনের বন্ধু তৈরি হয়ে থাকে। এদের স্থায়িত্ব হয় একদিন, দুদিন বা কয়েক মাস। এসব বন্ধু বিশ্বাস বা আস্থার জায়গায় থাকে হাতে গনা দু’একটি।

প্রায় ১যুগ আগে নিজ পরিবারসহ বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে বিদেশে আসতে হয়েছে আমাকে। প্রবাসে আসার পর নতুন করে আরেকটি বন্ধু মহল তৈরি হয়েছে।

জীবনে যতো বন্ধু আসবে স্কুল জীবনের বন্ধুরা হলো বেষ্ট। চিন্তা চেতনা হৃদয় জুড়ে আছে স্কুল জীবনের বন্ধুরা। বর্তমানে বন্ধুদের মধ্যে মানসিক দূরত্ব দেখতে পাচ্ছি।

তাই একে একে বন্ধু সবাইকে ফোন করতে লাগলাম। ডাক্তার এম এ হাতেম, ডাঃ ফজলুল হক বারেক অপু, ডাঃ গোলাম মোস্তফা সোহেল, ডা্ক্তার ফাহমিদা আক্তার জেরিন, এডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন শাহীন, বি.এস.সি আবু সায়েদ সায়েম, শামছুদ্দিন, কাজী আবু সায়েম সবুজ, কাজী আবু হেনা মেহেদী সুমন, মোঃ সাইফুল্লাহ, শহীদ উল্লাহ সুমন, শহীদুল ইসলাম আকাশ, আনোয়ার হোসেন বাবলু , মোঃ জহির উদ্দিন,  এ আর এম. ইয়াকুব হোসেন রাসেদ, মো.আব্দুল মতিন সুমন, ওয়াহিদ উল্লাহ, রহমত উল্লাহ, আজিজুর রহমান টিপু, আজিজুল হক কিরণ, আলা উদ্দিন মাসুদ, আলা উদ্দিন আলো, মোঃ গিয়াস উদ্দিন, শেখ সোহেল, মোঃ জহির উদ্দিন, আবু সালেহ ফরহাদ, সাহিদুল ইসলাম পলাশ, কাজী কামাল উদ্দিন, নুরুল হক মাসুদ, শিক্ষক আবুজর গিফারী নায়েব, শিক্ষিকা খালেদা আক্তারসহ প্রায় সব বন্ধুরা কেন আমার সাথে এমন আপনি আপনি করে কথা বলছে! স্কুল জীবনের ছোট বেলার বন্ধুরা আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করছে শুনে নিজেকে বেশ ছোট মনে হচ্ছিল।

অর্থ, স্বার্থ, শিক্ষা নাকি অন্য কোন কারণে? তাই পরাণ বন্ধুদের বলি ঘনিষ্ট বন্ধুরা পরস্পরকে তুই বলে ডাকে। যে কোন মর্যাদার দিক থেকে “বন্ধু” যত বড় হোক না কেন, বন্ধুত্বের মাঝে তুই সম্পর্ক না থাকলে কেমন যেন দূরত্ব দূরত্ব (লবন ছাড়া তরকারি) মনে হয়। তুই বললে একে অন্যকে কাছের আরো বেশি আপন মনে হয়। এ জন্যই প্রকৃত বন্ধুত্বের সম্পর্ক নিজের জীবন থেকে মূল্যবান হয়ে উঠে।

কথা হয় রঙ্গ রসের বন্ধু এডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন শাহিনের সাথে। সে থাকে নোয়াখালী মাইজদি শহরে। বর্তমানে তাকে খুব চঞ্চল মনে হচ্ছে। তার সাথে কথোপকথনে স্কুল জীবনে বন্ধুত্ব, আবেগ, খুনসুটি, মান অভিমানের কথা উঠে আসে। সকল সম্পর্কের আগে সম্মান না থাকলে কোন সম্পর্কই স্থায়ী বা টেকসই হয়না। সম্মানের জায়গায় থেকে পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে আপনি বা তুই বলা দোষের কিছু নয়। এডভোকেট সাহেব কি মনে করেন? তখন সে বলে তাইতো আমি আপনিতে আপন খুঁজে পাই।

অবশেষে বন্ধুরা স্বীকার করতে বাধ্য হলো আমি কেন তাদেরকে না জানিয়ে প্রবাসে গেলাম এবং দীর্ঘ সময় যোগাযোগ করলাম না কেন? তাই সব বন্ধুরা রাগ করেছে। মান অভিমানের কথাগুলো সবার কাছ থেকে উঠে এসেছে। (বন্ধুত্বের মান-অভিমান), (বন্ধুত্বের বন্ধন অটুট থাকুক আজীবন) বন্ধুদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে পেইজবুক গ্রুপ করা হয়েছে। এখন আবার যেন বন্ধুত্বের বন্ধন সজীবতায় ফিরে এল। সম্পর্কের গুরুত্বে সাময়িক দুরুত্ব হলেও সবাই যেন হারানো কৈশোর ফিরে ফেল। চোখের আড়াল হলেও মনের আড়াল হয়না আসল প্রকৃত বন্ধুরা এটাই প্রমাণিত।

দীর্ঘদিন পর ছোট বেলার শৈশব-কৈশোরে ফিরে গেলাম। কিযে আনন্দো লাগছে কাউকে বলে বুঝাতে পারবো না। সেই সময় সকল বন্ধুদের হাসি মুখখানা ভেসে আসলো। হঠাৎ ডোজন ডোজন এসএমএস আমার ফোনে। কনে পক্ষ থেকে এসেছে বরের কাছে। আর সেই বর হলো নায়েব। সন্তানের পিতা হয়েও নিজকে অবিবাহিত তরুন মনে করে। সে আমার স্কুল জীবনের চতুরদর্শি বন্ধু। দীর্ঘ সময় কেটেছে ফোনে গল্প আর স্কুল জীবনের স্মৃতির স্মরণিকার মধ্য দিয়ে। তখন বুঝলাম বন্ধুত্বের জীবন কতইনা মধুর। ফিরে গেলাম জীবনের সেই ফেলে আসা মুহূর্তে। সত্যি বন্ধুত্ব সম্পর্ক কখনোই বদলায় না, বদলায় সময়।

বন্ধুত্বের মূল্যায়ন সত্যি কি সবাই বুঝে? নিজকে প্রশ্ন করলে উত্তর অবিশ্যয়ই বেরিয়ে আসবে। যা কিছু বুঝি তবে ইশ…সেইটা আমরা হারিয়ে পেলার পর বুঝতে পারি। ইতি মধ্যে আমাদের মমতাজ বেগম আর আনোয়ার হোসেন পারভেজ নামে ২বন্ধুকে চিরদিনের জন্যে হারিয়েছি। জীবনে তাদের সাথে আর দেখা হবেনা। এজীবন থেকে হারিয়ে গেলেও হৃদয় থেকে নয়। তাদের নিয়ে অনেক স্মৃতি রয়েছে আমাদের। যা কখনো ভুলার নয়।

ছোট বেলায় আমাদের বন্ধুত্ব ছিল স্বার্থ এবং শর্ত ছাড়া। ঠিক তেমনি বন্ধুরা যত শিক্ষিত এবং অর্থে ধনী হোক না কেন, বন্ধু -বন্ধুই থেকে যায়। খেয়াল রাখতে হবে বড় স্বার্থপর যেন না হই কোন বন্ধু।

আমার সঙ্গে যাদের শিক্ষাজ্ঞনে সম্পর্ক ছিল তারা আমার সেই সময়ের বন্ধু। দক্ষিণ আফ্রিকা (প্রবাসে) আসার পর কয়েক বছর তেমন কারো সঙ্গে প্রথম দিকে ভালো যোগাযোগ ছিলো না। ফেসবুকের মাধ্যমে বা সোশ্যাল কাজ করতে গিয়ে একে একে প্রায় সবার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়। অহংকারী ইস্পাত কঠিন মনের দু’একজন বন্ধু ছাড়া সবার সাথে যোগাযোগ আজও আব্যহত রয়েছে। বন্ধুত্বহীন জীবন সত্যি মূল্যহীন। তাই আর ঘৃণা নয়, সুমিষ্ট হাসি দিয়ে বলি বন্ধু হও হাতটা বাড়াও। হৃদয়কে কোমল করে নাও সুভাস দিয়ে।

ভাল বন্ধু আজীবনের সম্পদ। অনেকেই সুইমিংপুলের পাশে থেকেও ময়লা ডোবাই গা-ভাসায়। প্রকৃত বন্ধু চিনতে ভুল করে। একটা ভুল সারাজীবনের কান্না। জীবনে ভালো আর মন্দ দু’ধরনের বন্ধু থাকে। তাই অনেকেই বন্ধুত্বের মর্ম বুঝতে পারে না। মরণকালে সুটে এসে সম্পর্কের গুরুত্বে ফুল দিয়ে তখন অশ্রু ছাড়া কিছুই (পাবেনা) থাকে না। তাই দাঁত থাকতে দাঁতের মর্মে বন্ধুত্বের সম্পর্কের মূল্যায়ন বুঝতে শেখ।

“বন্ধুত্ব” হাত আর চোখের মতো। হাত ব্যথা পেলে চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়ে। আবার চোখ দিয়ে পানি ঝরে পড়লে, তখন সেই ব্যথায় ব্যথাতুর হাতটি চোখের পানি মোছে দিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। সুতরাং ব্যথা আর চোখের পানির সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ, তেমনি বন্ধুত্বের বন্ধনও একই সুতায় গাথা। কর্মব্যস্ত জীবনে বন্ধুরা চড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও হৃদয় থেকে দূরে নয়। তাই সবার অন্তরজুড়ে থাকতে হবে ষোলআনা বাঁধন।

বর্তমানে আমার বন্ধুরা সমাজ সেবক রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, বড় অফিসার, ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার, এডভোকেট হয়েছে, কেউ কেউ বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়েছে। আমি আমার সকল বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে গর্ব করি।

জীবনে আইকিউ, মেধাশক্তি, জ্ঞানশক্তি সামাজিক (মর্যাদা) অবস্থা সব বয়সে সবার সমান হয় না। সবাই সবকিছু অর্জন করতে পারে না। এমন অনেকেই আছে ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত রোল ১ নিয়ে এসএসসি অংকসহ একাধিক বিষয়ে লেটার নিয়ে পাশ করে এবং অনার্স, মাস্টার্স বড় বড় সার্টিফিকেট অর্জন করে। কিন্তু তারা বাস্তব জীবনে এসে সংসার জীবন অংকের মতো সঠিক মিলাতে পারে না। তাই জীবনে সুখী হতে পারে না।

আবার ছোটবেলায় যে বন্ধু ক্লাসের পেছনে বসেছে হয়ত সে ভাল ছাত্র ছিল না। পরবর্তী জীবনেও যে তাকে পেছনে থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। মহান মালিকের কাছে সাফল্য চাওয়া, নিজের চেষ্টা, প্রচেষ্টা, কঠিন সাধনা, সঠিক সময় এবং যুগান্তকারী সিন্দান্ত নিয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। মানুষের জীবন পরিবর্তনশীল। জীবন চলার পথে যে জিনিষটার গুরুত্ব সব চেয়ে বেশি তা হলো আত্মবিশ্বাস। আর নিঃশ্বাসের মাঝে বেঁচে থাকে জীবন বন্ধুত্বের একমাত্র বিশ্বাসে।

অনেক বন্ধু পথভ্রষ্ট হয়ে অন্ধকারে ডুবে হাবুডুবু খাচ্ছে তাদেরকে বাঁচাতে হবে। যেন তারা অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। এ দায়িত্ব শুধু সরকার, বিশিষ্ট ব্যক্তি বা রক্তের সম্পর্কের ঘাড়ে চাপালে হবে না। ভাল বন্ধু হিসেবে আমাদের দায়িত্ব নিতে হবে।

কারণ পরিবারের কোন সদস্য বিপথে, অন্ধকারে ধংসের দিকে হারাতে শুরু করার সময় যে সিমটমগুলো প্রথমে দেখা যায়। সেগুলো পরিবারের আগে অন্য কেউ সচারচার লক্ষ্য করতে পারে না। তবে কিছু (নিকটবর্তী) কাছের প্রিয়বন্ধু উপলদ্বি করতে পারে। জীবনে সুখ দুঃখের অনেক কথাই বন্ধুর সাথে ভাগাভাগি করা হয়, যে কথাগুলো হয়তো পরিবারে কখনোই বলা হয়নি। আমি মনে করি একজন ভাল বন্ধুই হতে পারে জীবন পরিবর্তন করার জন্য যথেষ্ট। জীবনে শ্রেষ্ঠ বন্ধুর দাবি না করে একজন ভাল বন্ধু হওয়া প্রয়োজন। জীবনে সব চেয়ে বড় পাওয়া হবে তখনই যখন যে কোন বন্ধুর মানুষিক দিকসহ সকল বিপদে-আপদে এগিয়ে এসে পাশে থাকতে পারবে।

জীবনে বন্ধুর পাশে এগিয়ে আসার মধ্যে সার্থকতা। তাইতো প্রচলিত প্রবাদ আছে -“বিপদে বন্ধুর পরিচয়। আসলেও তাই। একটাই কামনা পৃথিবীর সব বন্ধুরা অনেক অনেক আনন্দে উৎসবে থাকুক। কাউকে যেন কোন বন্ধু দ্বারা কষ্টের কারন না হতে হয়। আর একটা কথা জীবনের ক্লান্তিলগ্নে শুধু রক্তের সম্পর্কগুলো পাশে থাকলেও তার পাশে কিছু ভালো বন্ধু থাকে। আর সেই ভালো বন্ধু যেন আমরা হতে পারি। 

লেখক: কলামিস্ট

আরো পড়ুন- বন্ধুত্বের মান-অভিমান