চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়লেও পিছিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে

জাহাঙ্গীর আলম ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম: দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রামে বিগত ৪৪ বছরের মধ্যে চলতি বছর সর্বোচ্চ সংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং-এর রেকর্ড গড়েছে।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩২ লাখ। ১৯৭৭ সালে বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংখ্যাটিই সর্বোচ্চ। তবে অভ্যন্তরীণভাবে উন্নতি হলেও কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পিছিয়েই রয়েছে বাংলাদেশ। আর বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, অবস্থানের দিক থেকে পেছালেও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে আন্তর্জাতিক একটি তালিকায় গত বছর তার আগের চেয়ে নয় ধাপ অবনমন ঘটে চট্টগ্রাম বন্দরের। শিপিংবিষয়ক লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘লয়েড’স লিস্ট’-এর ২০২১ সালের শেষের দিকে করা ওই তালিকায় এই অবনমনের তথ্য উঠে আসে। ২০২০ সালে বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরগুলো যে সংখ্যক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয় এ তালিকা। বন্দর ও শিপিংসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পরিম-লে লয়েড’স লিস্টের র‌্যাংকিং বেশ গুরুত্ব পেয়ে থাকে।

প্রতিবছরই কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বিশ্বের ১০০ শীর্ষ বন্দরের তালিকা তৈরি করে এই সংবাদমাধ্যমটি। ২০২১ সালে যে র‌্যাংকিং করা হয়েছে তাতে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৭তম। ২০২০ সালে লয়েড’স লিস্টের তালিকায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের অবস্থান ছিল ৫৮তম। অর্থাৎ এক বছরে নয় ধাপ পিছিয়েছে। অথচ এর আগের দুই বছরের অগ্রগতি ছিল রূপকথার মতো। ২০১৯ সালে ৬ ধাপ এগিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ১০০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিংকারী বন্দরের মধ্যে ৬৪তম স্থানে উঠে এসেছিল চট্টগ্রাম বন্দর। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে আরও ৬ ধাপ এগিয়ে ৫৮তম অবস্থানে পৌঁছে যায়। দুই বছরের অগ্রগতির শ্রোত সেই ২০২১ সালে এসে প্রবাহিত এখন উলটাদিকে। লয়েড’স লিস্টের বৈশ্বিক তালিকায় ২০১৩ সাল থেকে পরের সাত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক উন্নতি হয়েছিল। ২০১৩ সালে এ বন্দরের অবস্থান ছিল ৮৬তম। তবে এই অবনমনের চেয়ে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কৃর্তৃপক্ষ জানায়, করোনা পরিস্থিতিসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেও বন্দর চেয়ারম্যানের চৌকস নেতৃত্ব, সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপ্রচেষ্টা এবং আমদানি-রপ্তানিকারকদের সহযোগিতায় কন্টেইনার হ্যান্ডলিং-এ ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। সদ্যসমাপ্ত ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি ২২ ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান জেটি এবং বন্দরের অধীন কেরানীগঞ্জের পানগাঁও ও ঢাকার কমলাপুরের ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে (আইসিডি) কনটেইনারে হ্যান্ডলিং-এর সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ। এর আগে ২০১৯ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং এর সংখ্যা ছিলো ৩০ লাখ। তবে ২০২০ সালে এই সংখ্যা ৩০ লাখের নিচে নেমে আসে। তবে ২০২১ সালে ১৯৭৭ সাল থেকে সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে ৪৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং-এর রেকর্ড গড়তে সক্ষম হয় চট্টগ্রাম বন্দর। এদিকে বাংলাদেশে রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে সবচেয়ে বেশি কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয় গার্মেন্টস পণ্যের।

কন্টেইনার হ্যান্ডলিং-এর রেকর্ড প্রসঙ্গে বিজিএমইএর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম আমার সময়কে জানান, করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি এবং সার্বিক সু-ব্যবস্থাপনার কারণেই বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং-এর রেকর্ড হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সকলকেই সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্দরের বর্তমান আধুনিক অবকাঠামোতে বছরে প্রায় ৪০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং-এর সক্ষমতা রয়েছে। এদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাবকে বন্দর কৃর্তৃপক্ষের মতো গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো সংবাদমাধ্যম লয়েড’স লিস্ট। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে তৈরি পোশাকশিল্প বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিংও কম হয়। শুধু চট্টগ্রাম বন্দর নয়, করোনা মহামারির প্রভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্য কম হওয়ায় বিশ্বের আরও অনেক বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দিক থেকে পিছিয়ে গেছে। এতে আরও বলা হয়, ২০২০ সালের প্রথম অর্ধে মহামারির কারণে বিশ্বের কনটেইনার বন্দর সেক্টর নিম্নমুখী হলেও পরের অর্ধে বিশ্ব লকডাউন থেকে বেরিয়ে আসতে থাকলে আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পক্ষ থেকে বলা হয়, করোনার প্রভাবে আমদানি-রপ্তানি কম হওয়ায় লয়েড’স লিস্টের তালিকায় এই বন্দর পিছিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কেননা, লয়েড’স লিস্ট বন্দরের মান বা সক্ষমতা যাচাই করে না।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক আমার সময়কে বলেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের তথ্যের ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে। ওই সময় আমাদের দেশ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনা মহামারির কারণে কঠোর লকডাউন ছিল। অনেক শিল্পকারখানা ছিল বন্ধ। তাই সীমিত হয়ে পড়েছিল আমদানি-রপ্তানি। ফলে ওই বছর কনটেইনার হ্যান্ডলিং কিছুটা কম হয়েছে। লয়েড’স লিস্ট শুধু কনটেইনার সংখ্যার ভিত্তিতে তালিকাটি তৈরি করে। বন্দরের সক্ষমতা বা অন্য কোনো সূচক তারা বিবেচনায় নেয় না। তাই কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দিক থেকে অবস্থান পেছালেও এতে বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই।