চট্টগ্রামে বন্দরে আবারও সপ্তাহের ব্যবধানে সিগারেটের জাল স্ট্যাম্পের কনটেইনার জব্দ

জাহাঙ্গীর আলম ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম: মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরে আবারো অভিনব কায়দায় এ-ফোর সাইজ প্রিন্টিং পেপারের ভিতর লুকিয়ে আনা সিগারেটের অবৈধ জাল স্ট্যাম্পের কনটেইনার জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। চালানে এক কোটি ৬২ লাখ পিস জাল স্ট্যাম্প পাওয়া যায়। যা খালাস হয়ে গেলে সরকার প্রায় শত কোটি টাকা রাজস্ব হারাতো। বিষয়টি আমার সময়কে নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের উপ-কমিশনার (প্রশাসন) সালাউদ্দিন রিজভী

এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার আর্ট পেপারের আড়ালে লুকিয়ে চীন থেকে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার পিস জাল স্ট্যাম্প আমদানি করা চালান আটক করেছিল চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস কর্তৃপক্ষ। সেই জাল স্ট্যাম্প ধরা না পড়ে বন্দর থেকে খালাস হয়ে বাজারের সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহার করা হলে সরকার হারাতো কমপক্ষে ৯০ কোটি টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৪৩ কোটি টাকার রাজস্ব।

কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকেই সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহৃত স্ট্যাম্প প্রিন্ট করাতে হয়। এর বাইরে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের স্ট্যাম্প ক্রয় করা বা বিদেশ থেকে আমদানি করার কোন সুযোগ নেই। তবে এক শ্রেণির প্রতারক চক্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দুটি সিগারেটের জাল স্ট্যাম্প চীন থেকে আমদানি করে।

২৩ ডিসেম্বর বুধবার আটক হওয়া চালানের বিস্তারিত তথ্যে জানা যায়, চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন জুবিলি রোডের কাদের টাওয়ারের চতুর্থ তলার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আরাফাত এন্টারপ্রাইজের নামে চীন থেকে কাগজের চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ওই চালানের বিপরীতে ইউনিয়ন ব্যাংক জুবিলি রোড শাখা থেকে গত ৮ নভেম্বর এলসি ইস্যু করা হয়েছিল।

কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পোর্ট কনট্রোল ইউনিট (পিসিইউ) ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় রপ্তানিকারক, রপ্তানিকারকের ওয়েবসাইট, পণ্য তৈরির দেশ, আমদানিকারকের ব্যবসার ধরণ ও ঠিকানা, পণ্যের বিবরণ ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে পণ্য চালানটিতে মিথ্যা ঘোষণায় সিগারেটের মোড়কে ব্যবহারযোগ্য জাল স্ট্যাম্প থাকার বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পায়। এ তথ্যের ভিত্তিতে কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন এন্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্কায়ন সফটওয়ার এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে চালাটি লক করে এর খালাস বন্ধ করে দেয়।

পরে ২২ ডিসেম্বর বুধবার চালাটির কনটেইনার ফোর্স কিপ ডাউনের মাধ্যমে নামিয়ে বন্দরের ভেতরে নিয়ম অনুযায়ী এআইআর টিম পরীক্ষা শুরু করে। প্রতিটি পণ্যের প্যাকেট কেটে শতভাগ কায়িক পরীক্ষার পর দেখা যায় কনটেইনারটিতে থাকা ১২ প্যালেটের মধ্যে ৪টিতে ১২০ কার্টন (নিম্নস্তর ১০৫ কার্টন ও মধ্যম স্তর ১৫ কার্টন) বাংলাদেশের সিগারেটে ব্যবহারের উপযোগী হালকা সবুজ ও হালকা খয়েরি রঙের জাল স্ট্যাম্প রয়েছে। প্রতি কার্টনে ২৭০ বান্ডিল এবং প্রতি বান্ডিলে ৫০০ পিস হিসেবে মোট ১ কোটি ৬২ লাখ পিস ব্যান্ড রোড বা স্ট্যাম্প ছিল ওই চালানে। এর মধ্যে নিম্নস্তরের ১ কোটি ৪১ লাখ ৭৫ হাজার পিস এবং মধ্যম স্তরের ২০ লাখ ২৫ হাজার পিস রয়েছে। যার ওজন ১ হাজার ২০০ কেজি।

বাকি ১ হাজার ১৪০ কার্টনে এফোর সাইজের কাগজ পাওয়া গেছে যার মোট ওজন ১৪ হাজার ৩৮০ কেজি এবং নিট ওজন ১২ হাজার ৫৪০ কেজি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট এসআরও অনুযায়ী নিম্নস্তরের খয়েরি রঙের সিগারেট স্ট্যাম্পের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৯-৬২ টাকা। এর বিপরীতে এসডি’র হার ৫৭ শতাংশ, মূসকের হার ১৫ শতাংশ। মধ্যম স্তরের সিগারেট স্ট্যাম্পের রং হালকা সবুজ, যার খুচরা মূল্য ৬৩-১০১ টাকা। এসডি ৬৫ শতাংশ, মূসক ১৫ শতাংশ।

চট্টগ্রাম কাস্টসের সহকারী কমিশনার (এআইআর শাখা) মো. শরফুদ্দিন মিয়া জানান, এই জালিয়াতিতে জড়িত দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কবাস্টমসের প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রসঙ্গত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিধান অনুযায়ী স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া সংশ্লিষ্ট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কর্তৃক দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ এবং সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রতি ৩ মাস অন্তর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সিগারেট স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল সরবরাহ ও ব্যবহার আড়াআড়ি যাচাই করে এর প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মূসক বাস্তবায়ন শাখায় প্রেরণ করতে হয়। ফলে এই জাতীয় পণ্য দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ক্রয় করা বা বিদেশ থেকে আমদানি করার কোন সুযোগ নেই।