গোয়ালন্দ যৌথ ব্যাবসার কথা বলে প্রবাসীকে সর্বশান্ত

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী)প্রতিনিধিঃ জীবনের সব স্বাদ আল্লাদ ও আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পরিবার পরিজন কে দুরে রেখে পরবাসে থেকেছেন দীর্ঘ বত্রিশ বছর। পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য। বৃদ্ধ বয়সে অন্তত একটু শান্তিতে পরিবার পরিজন নিয়ে থাকার জন্য ভেবে ছিলেন সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে দেশেই কিছু করার জন্য। কিন্তু কিন্তু মিষ্টি মিষ্টি কথা আর আর নতুন নতুন প্রতারণার কৌশলের কাছে সারাজীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে এখন নিঃস্ব অবস্থায় দারে দারে ঘুরছেন তার সারা জীবনের সঞ্চয় ফিরে পাবার জন্য। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস।
ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলায় যৌথ মালিকানায় ডেইরী, পোল্ট্রী ও ফিসারিজের প্রজেক্ট করে ব্যবসা পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সৌদি প্রবাসী ওবায়দুল মালিকের  কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা মূলধন নিয়ে এখন সেই টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার ফরিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের লক্ষে অভিযোগকারী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উকিল নোটিশ করা সহ রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার বরাবর অভিযোগ করেছেন।
প্রবাসী ওবায়দুল মালিক ফোনে জানান, তার বাড়ী রাজবাড়ী জেলা সদরে। তিনি ৩২ বছর ধরে সৌদি আরবে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি বয়সের ভারে আগের মত আর পরিশ্রম করতে পারেন না। নিজ মাতৃভূমির টানে এবং দেশের মানুষের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির লক্ষ্যে তার কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ২০১৭ সাথে দেশে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। এক্ষেত্রে সৌদি আরবে আরেক প্রবাসী ফরিদ মিয়ার মাধ্যমে তার আত্মীয় ফরিদুল ইসলামের (ফরিদ মেম্বার) সাথে পরিচয় হয়। দীর্ঘ কথাবার্তা ও আলোচনার পর তারা গোয়ালন্দে যৌথ ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ী তারা একটি চুক্তিনামা করে ব্যবসায়ীক কার্যক্রম শুরু করেন। চুক্তিনামা অনুযায়ী প্রবাসী ওবায়দুল মালিক নিজের সোনালী ব্যাংকের ওডি হিসাব থেকে ফরিদুল ইসলামের সোনালী ব্যাংকের গোয়ালন্দ উপজেলা কমপ্লেক্স শাখার একাউন্টে ৫০ লক্ষ টাকা স্থানান্তর করেন এবং ওই টাকা ফরিদুল ইসলাম ব্যবসায় খরচ দেখান। শুরু থেকেই ফরিদুল ইসলাম চতুরতার আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন ভাবে তার সাথে প্রতারনা করা শুরু করে। এক পর্যায়ে ব্যবসার হিসেব নিয়ে ফরিদুল ইসলামের সাথে কথা বললে, তিনি গালিগালাজসহ তার সাথে চরম খারাপ ব্যবহার করে এবং চুক্তিনামার শর্ত অস্বীকার করে।
তিনি আরো বলেন, ‘সৌদি আরবে দীর্ঘ ৩২ বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রমের প্রবাস জীবন কাটিয়ে জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় ফরিদুল ইসলাম আমার স্বপ্ন ভেঙে খান খান করে দিয়েছে। স্বপ্ন ছিল দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। কিন্তু ফরিদুল ইসলাম সেটা করতে দিল না।’
সরেজমিন গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের হারেজ মিয়ার পাড়া গ্রামে ফরিদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পূর্বে কাঁচা ঘর থাকলেও তিনি বাড়িতে বহুতল বভন নির্মানের কাজ করছেন। ইতিমধ্যে দুই তলার কাজ শেষ করেছেন। বাড়ির পাশেই ওবায়দুল মালিকের সাথে যৌথ ভাবে শুরু করা প্রজেক্ট। গরু পালনের জন্য পূর্বে বড় আকারের সেড থাকলেও বর্তমানে তা ভেঙে ছোট করা হয়েছে। মুরগী পালনের জন্য ৩টি সেড রয়েছে। মাছ চাষের জন্য পুকুরও রয়েছে।
আলাপকালে ফরিদুল ইসলাম জানান, ওবায়দুল মালিকের সাথে চার বছর আগে এই ফার্ম শুরু করলেও বর্তমানে তিনি একাই এটার মালিক। তিনি দাবি করেন, ওবায়দুল মালিকের কাছ থেকে তিনি ৫০ লাখ টাকা গ্রহন করেননি। ৩৫ লাখ টাকা গ্রহন করেছেন। আর ১৫ লাখ টাকা তার জামাতা সাখাওয়াত মন্ডল নিয়েছেন। ওটা তা বিষয় না। অনেক আগেই ওবায়দুল মালিকের সাথে ব্যবসায়ীক সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৮লাখ টাকা ওবায়দুল মালিককে ফেরত দেয়া হয়েছে, বাকি টাকা ২০২২ সালের মধ্যে ফেরত দিয়ে দিব। তাহলে তিনি কেন ৫০ লাখ টাকার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখন আমাকে দিয়ে জোরপূর্বক ওই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়।
এ বিষয়ে প্রবাসী ওবায়দুল মালিক জানান, তিনি স্বোচ্ছায় চুক্তিপত্র করেছিলেন। আমি তাকে কিভাবে জোর করব। এছাড়া ফরিদুল ইসলাম কোন টাকা ফেরত দেননি। তিনি ৫০ লক্ষ টাকার ব্যাংক মুনাফা ও লভ্যাংশ হিসেবে ৪ বছরে ১৮ লক্ষ টাকা জমা দিয়েছেন।
পূর্বাশা পোল্ট্রী ফিডস এর মালিক আব্দুর রহমান জানান, ব্যবসায়ীক কারণে আমি ওবায়দুল মালিক ও ফরিদুল ইসলামের যৌথ ব্যবসার বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের স্বাক্ষী হয়ে যাই। প্রবাসী ওবায়দুল মালিক একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু ফরিদুল ইসলাম ব্যবসায়ীক চুক্তি পত্রের বিভিন্ন শর্ত ভঙ্গ করায় তার সে উদ্দেশ্যে সফল হয়নি।
গোয়ালন্দ রাইচ মিলের মালিক সোহাগ মিয়া জানান, ফরিদুল ইসলাম গোখাদ্য হিসেবে তার মিল থেকে কুড়া নিত। কিন্তু বিভিন্ন সময় যে পরিমান মাল ক্রয় করত তার চেয়ে বেশী ভাউচার নিতে চাইত। আমি সেটায় রাজি ছিলাম না। পরবর্তীতে প্রবাসী ওবায়দুল মালিক নিজে আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করে মাল কিনতেন।
সোনালী ব্যাংক গোয়ালন্দ উপজেলা কমপ্লেক্স শাখার ম্যানেজার রাসেল আহমেদ জানান, ওবায়দুল মালিকের একাউন্ট থেকে ফরিদুল ইসলামের একাউন্টে স্থানান্তর হয়ে আসা টাকা তার শাখা থেকেই উত্তোলন করা হয়েছে। একজন যদি স্বেচ্ছায় তার টাকা স্থানান্তর করে, সেটা তার ছাড় করতে বাধ্য। এত বড় এমাউন্ট ওবায়দুল মালিক এভাবে একজনকে কেন দিয়ে দিল, সেটাই বুঝে আসে না বলে তিনি জানান।