গায়েবিভাবে নিয়োগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসায়, এমডি’র আত্মীয় দম্পতি!

জাহাঙ্গীর আলম চট্টগ্রাম: চাকরির জন্য করা আবেদন যথাযথ না হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। প্রাথমিক আবেদন বাতিল হওয়ায় অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারার কথা নয়। অথচ নিয়োগ পেয়ে গত কয়েকবছর ধরে চাকরি করে চলেছেন তারা। সম্পর্কে তারা স্বামী-স্ত্রী। কাজও করেন একই বিভাগে। তারা দুজন হলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান এবং সিস্টেম এনালিস্ট শফিকুল বাশার। ওয়াসা এমডির ভাগনি ও ভাগনি জামাই বলে পরিচিত তারা। এই সম্পর্ককের কারণে কোনো নীতির তোয়াক্কা না করে তাদের ওয়াসায় নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

সরকার অনুমোদিত ‘চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালায়’ মোট পদ রয়েছে ৭৬টি। প্রবিধানমালায় নেই ‘কম্পিউটার প্রোগ্রামার’ পদটি। অথচ এই পদটিতে ২০১২ সালের ৭ নভেম্বর যোগদান করেন লুৎফি জাহান। পদটির জন্য আহব্বান করা বিজ্ঞপ্তিতে তিন বছরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ ছিল। কাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতা না থাকা ও আবেদনে সংযুক্ত কাগজের ফটোকপি সত্যায়িত না করার কারণে লুৎফি জাহানের চাকরির আবেদন বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু বাতিল হওয়া সেই প্রার্থীকে পরবর্তিতে গায়েবিভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, প্রবিধানমালা বহির্ভূত পদে নিয়োগ পাওয়া লুৎফি জাহানের পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটও জমা পড়েনি বিগত ৮ বছরে।

লুৎফি জাহানের স্বামী শফিকুল বাশার। তিনিও গায়েবিভাবে নিয়োগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসায়। চাকরির জন্য করা আবেদন পত্রের সাথে সংযুক্ত কাগজের ফটোকপি সত্যায়িত না হওয়াতে তার আবেদনটিও বাতিল হয়ে যায়। আবেদন বাতিল হওয়াতে পরবর্তি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তার অংশ নেয়ার কথা না থাকলেও তিনি ২০১৬ সালের ৬ জুন চাকরিতে যোগদান করেন।

এখানেই শেষ নয়, গায়েবিভাবে নিয়োগ পাওয়া লুৎফি জাহান ও শফিকুল বাশারের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রত্যায়নও ভুয়া।দু’জনেই চট্টগ্রাম ওয়াসার মেডিকেল অফিসার দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রত্যায়ন জমা দেন। ডা. মো. মোছলেহ উদ্দীনের নিজস্ব প্যাডে এই প্রত্যায়ন জমা দেয়া হয়নি। তাছাড়াও স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রত্যায়নের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির দু’রকমের স্বাক্ষর দ্বারা প্রত্যায়ন এবং ফরম্যাটও ভিন্ন ছিল।

এসব বিষয়ে জানতে কম্পিউটার প্রোগ্রামার লুৎফি জাহান ও সিস্টেম এনালিস্ট শফিকুল বাশারের দপ্তরে কথা বলতে গেলে তারা ব্যস্ততা দেখিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যান। একই বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ফাইনান্স) ছামছুল আলমের দপ্তরে তিনদিন গিয়ে অপেক্ষা করলেও তিনি কথা বলার সুযোগ দেননি। উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এডমিন) জাহানারা বেগমের দপ্তরে গেলে তিনি সচিব শারমিন আলমের সাথে কথা বলতে বলেন। অন্যদিকে শারমিন আলমের দপ্তরে একাধিকবার গিয়েও তার দেখা পাওয়া যায়নি।

এমন নিয়োগ সম্পর্কে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, অডিট রিপোর্ট মিথ্যা দিয়েছে। আমরা উত্তর দিয়ে দিয়েছি। ওদের (কম্পিউটার প্রোগ্রামার ও সিস্টেম এনালিস্টের) সবই আছে, এক্সপেরিয়েন্স আছে, সার্টিফিকেট আছে। এগুলো ছাড়া নিয়োগ দেয় কিভাবে? আমাদের এখানে তিন-চারটা চেক হয়। প্রথম ওদের যখন ইন্টারভিউ কার্ড ইস্যু হয় তখন একটা চেক হয়। একটা কমিটি আছে, আমাদের এখানে কিছু করার নেই। কমিটির পরীক্ষা নেয়, সুপরিয়ার কমিটি হয় সেখানে মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব থাকেন, আমিও থাকি সেখানে। পরীক্ষা হয়, এরপর ভাইবা হয়। এভাবে নিয়োগ হয়।

আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইম্পসিবল, ওরা আমার কোনো আত্মীয় না। এমডি সাহেবের বিষয়ে তো কত কথা বলে। আমি কি জন্য চাকরি দিব। আমি তাদের চিনিও না।

চট্টগ্রাম ওয়াসায় বিগত তিন বছরের অডিট কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তর। অডিট টিমের তদন্তেও স্বামী-স্ত্রীর গায়েবি নিয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। ফলে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের অডিট এন্ড একাউন্টস অফিসার মো. মোহসীন সোহাগ স্বাক্ষরিত পত্রে ওয়াসার কাছে এ নিয়োগের জবাব চাওয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চট্টগ্রাম ওয়াসা, ওয়াসা ভবন, দামপাড়া, চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ২০১৮-১৯ হতে ২০২০-২০২১ অর্থবছরের হিসাব ১২/০৯/২০২১ হতে ১৬/০৯/২০২১ তারিখ পর্যন্ত সময়ে স্থানীয়ভাবে নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষাকালে দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে কর্মরত লুৎফি জাহান এবং শফিকুল ইসলাম এর চাকরির শর্তাবলী উপেক্ষা করে অসম্পূর্ণ আবেদনপত্র বাতিল না করে আনুকূল্য প্রদর্শনপূর্বক নিয়োগ প্রদান করা হয়।’

এতে আরো বলা হয়, ‘বিস্তারিত নিরীক্ষায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে কর্মরত লুৎফি জাহান, কম্পিউটার প্রোগ্রামার এবং শফিকুল বাশার সিস্টেম এনালিস্ট দু’জনকে যথাক্রমে চট্টগ্রাম ওয়াসার উচ্চতর সিলেকশন বোর্ডের ৩৬তম এবং ৪৫তম সভায় সুপারিশের প্রেক্ষিতে স্মারক নং প্রশাসন-৬৯৮/৯৩/২০১১অংশ-৮/১৩৫১ তারিখ ঃ ০৪/১১/২০১২ এবং স্মারক নং প্রশাসন-৬৯৮/৯৩/২০১২/অংশ-১০/৭৭১ তারিখঃ ২৯/০৫/২০১৬ খ্রি. মোতাবেক তৎকালীন সচিবের স্বাক্ষরে নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়। সে প্রেক্ষিতে ০৭/১১/২০১২ এবং ০৬/০৬/২০১৬ তারিখে তারা যোগদান করেন। অথচ লুৎফি জাহানের আবেদনে সংযুক্ত ফটোকপি সত্যায়িত করা নাই এবং শফিকুল ইসলামের আবেদনেও সংযক্ত ফটোকপি সব সত্যায়িত করা নাই। এছাড়াও লুৎফি জাহানের আবেদনে বাছাই কমিটি কর্তৃক ৩ বছরের অভিজ্ঞতা নেই বলে লাল কালিদ্বারা ক্রস দেয়া হয়েছে এবং শফিকুল বাশারের জাতীয়তা সনদ নাই বলে আবেদনে লাল কালিদ্বারা বাদ লিখা হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার মেডিকেল অফিসার দ্বারা স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রত্যায়ন ডা. মো. মোছলেহ উদ্দীনের নিজস্ব প্যাডে দেয়া নাই। তাছাড়া বর্ণিত দু’জনের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির দু’রকম স্বাক্ষর দ্বারা প্রত্যায়ন সংগ্রহ করা হয় এবং ফরম্যাটও ভিন্ন। লুৎফি জাহানের পুলিশ ভেরিফিকেশন নাই। সংশ্লিষ্ট ৬ষ্ঠ ও ৫ম গ্রেডে নিয়োগ দেয়া এ দু’জনের আবেদনপত্র এবং অন্যান্য কিছুতে এতো অসম্পূর্ণ থাকা সত্তে¡ও কিভাবে চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হলো তা বোধগম্য নয়।’

প্রবিধানমালায় পদ না থাকার পরও কিভাবে কম্পিউটার প্রোগ্রামার পদের বেতন উত্তোলন হচ্ছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (অ.দা.) আল মেহেদী শওকত আজম বলেন, অবশ্য প্রবিধানমালায় পদ না থাকলে বেতন হওয়ার কথা না। কিন্তু কম্পিউটার প্রোগ্রামার আমাদের সেটআপে আছে। প্রবিধানমালা থেকে পদটি বাদ পড়ে গেছে। মানবিক কারণে তাদের বেতন বন্ধ করা হয়নি। প্রশাসন শাখা থেকে বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে লিখছে। এটার সমাধান হয়ে যাবে।