কেরানীগঞ্জে নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক ও সাউন্ড বক্সের উচ্চশব্দে অতিষ্ঠ পরিক্ষার্থীরা 

কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা, আগানগর, কালিন্দী, বাস্তা, শাক্তা,হযরতপুর,
শুভাঢ্যাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড সদস্য
প্রার্থীরা রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে প্রচারণামূলক 
গান ও স্লোগান প্রচার করছেন। এসব ভ্রাম্যমাণ মাইকের উচ্চ শব্দে সবচেয়ে
বেশি বিপাকে পড়েছে চলমান এসএসসি ও আসন্ন এইচএসসির পরীক্ষার্থীরা।
এনামুল হাসান,স্টাফ রিপোর্টার 
আসন্ন তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে কেরানীগঞ্জের পাড়া মহল্লায় চলছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। প্রার্থীদের পক্ষে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত উচ্চ শব্দে মাইকিং চলছে । এছাড়া সড়কের মোড়ে প্রার্থীদের অস্থায়ী ক্লাবগুলোতে দিনভর উচ্চশব্দে বাজছে সাউন্ড বক্স ও মাইক। এতে উচ্চশব্দের কারণে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়াশুনা করতে না পেরে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
জানাগেছে, চলতি বছরের গত ১৪ নভেম্বর থেকে সারাদেশে একযোগে শুরু হয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের এসএসসি পরীক্ষা। যা চলবে আগামী ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত। কেরানীগঞ্জ উপজেলা থেকে এবছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষর্থীর সংখ্যা মোট ৭ হাজার ৮৭৫ জন। এদিকে ২৮ নভেম্বর তৃতীয় ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে পাড়া-মহল্লায় মাইকিং ও সাউন্ড বক্সের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা জমে উঠলেও বিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের জন্য তা হয়ে দাঁড়িয়েছে অস্বস্তিকর। কখনও গানে, কখনও আবৃত্তির ঢঙে একক ও দ্বৈতকণ্ঠে মাইকিং করে চলছে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা। এতে উচ্চ শব্দের কারণে শিক্ষার্থীরা মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে না পেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সরেজমিনে কেরানীগঞ্জ উপজেলার জিনজিরা, আগানগর, কালিন্দী, বাস্তা, শাক্তা, হযরতপুর, শুভাঢ্যাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ইউপি চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড সদস্য প্রার্থীরা রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে প্রচারণামূলক গান ও স্লোগান প্রচার করছেন। এসব ভ্রাম্যমাণ মাইকের উচ্চ শব্দে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থী ও আসন্ন এইচএসসির পরীক্ষার্থীরা। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে রাত আটটার পরও প্রার্থীদের প্রচারণায় বের হচ্ছে মিছিল। উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেলের হর্ণ বাজিয়ে, মাইকে গান বাজিয়ে ও ভুবুলেজা বাজিয়ে উপজেলার বিভিন্ন পাড়ামহল্লায় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার ও প্রচারণা চলছে।
মাসুদ রানা নামের এক এসএসসি পরিক্ষার্থী বলেন, মাইকের শব্দে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে অনেক সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। রাস্তা-ঘাটে, অলিগলিতে কান ফাটানো আওয়াজ শুনে পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটছে। পাড়ার মোড়ে নির্বাচনী কার্যালয়ে সাউন্ড বক্স আর বাইরে রাস্তায় রিকশা কিংবা সিএনজি অটোরিকশায় চলছে মাইকিং। এমন অবস্থায় পড়ালেখা করতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা পরীক্ষার্থীরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রশাসনের এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অপর পরীক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষার আগের দিন পড়া রিভিশন দিতে গিয়েও কানে পৌঁছায় উচ্চশব্দের মাইকের আওয়াজ। প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় উচ্চ শব্দে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলা মাইকিং এর আওয়াজ পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। আমরা সঠিকভাবে প্রস্তুতি ও মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে পারছিনা। সরকারের এসব বিষয়গুলো দেখা উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এসএসসি পরিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, মাইকের উচ্চ শব্দে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এলাকার কেউ এ  বিষয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানালে বিপদে পড়তে হবে বলে কেউ কিছু বলছে না। তাই সবাই নিরুপায় হয়ে এসব সহ্য করছেন। তিনি আরও বলেন, এসএসসি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে অনেক বড় ভূমিকা রাখে। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে আমাদের সন্তানেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারের এসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্কুল শিক্ষক নাজিবুল্লাহ বলেন, নির্বাচন হচ্ছে বলে আইন কেন ভাঙতে হবে? শিক্ষিত সমাজের সবাই একটু সচেতন হলেই তো হয়। ছেলে-মেয়েরা জীবনের বড় দুটো পরীক্ষা দিচ্ছে, তাদের কথা কেউ ভাবছে না। এ কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
অথচ নির্বাচনী প্রচারণায় মাইক ব্যবহারে নির্বাচন কমিশনের বিধি রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ বিধিমালা (নির্বাচন আচরণ) ২০১৬ অনুযায়ী, নির্বাচন পূর্ব অর্থাৎ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে ফল গেজেট আকারে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত কোনো প্রাথীর মিছিল বা শোডাউন করতে পারবেনা। দুপুর দুইটার আগে এবং রাত আটটার পর মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। একজন প্রার্থী একটি করে মাইক ব্যবহার করতে পারবেন। জনগণের চলাচলের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে সড়কে এমন কোনো পথসভা করতে পারবেন না। কিন্তু কেরানীগঞ্জে সচেতনতার অভাবে এবং অন্যদিকে আইন প্রয়োগে অবহেলার কারণে মাইক ব্যবহারকারী প্রার্থীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে বলে মনে করেন সচেতন মহলের অনেকেই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ওয়ার্ড ইউপি সদস্য প্রার্থী বলেন, পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় এনে মাইকের মাধ্যমে যতটুকু প্রচার না করলেই নয়, ঠিক ততটুকুই করা উচিত। কেননা এতে আমাদের সন্তানদেরই ক্ষতি হচ্ছে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ ইসমাইল বলেন, এ পরীক্ষার্থীরাই আমাদের সন্তান, আমাদের আগামীর ভবিষৎ। আগামীতে তারাই দেশের নেতৃত্ব দেবে। তাঁদের ক্ষতি হয় এমন কাজ করা যাবে না। চলমান এসএসসি ও আগামী ২ ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত হয় এমনভাবে প্রার্থীর প্রচার প্রচারণা করা যাবেনা। এ বিষয়ে ইউপি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সচেতন হতে হবে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আব্দুল আজিজ বলেন, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিষয়ে প্রত্যেক প্রার্থীকে অবহিত করা হয়েছে। প্রত্যেক প্রার্থীকেই নির্বাচনী আচরণবিধি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। এরপরও যদি কেউ নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।