কেরানীগঞ্জের ১৫০ বছর পুরনো মসজিদ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেলো

এনামুল হাসান: রাজধানীর উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ১৫০ বছরের পুরনো একটি মসজিদ জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা (ইউনেস্কো) এর স্বীকৃতি পেয়েছে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউনিয়নের দোলেশ্বর এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন এই মসজিদটির নাম ‘দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ’। চলতি বছরের পহেলা ডিসেম্বর ইউনেস্কোর এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কার্যালয় থেকে অনলাইনে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জানাগেছে, ১৮৬৮ সালে প্রাচীন ঐতিহ্যের দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদদের নির্মাণ কাজ মরহুম দারোগা আমিনউদ্দিন আহাম্মদ শুরু করেন। মসজিদটি ‘দারোগা মসজিদ’ নামেও পরিচিতি ছিলো। পরবর্তীতে এ পরিবারের সদস্যসরা বংশ পরম্পরায় মসজিদটি নির্মাণ ও সংস্কার কাজে জড়িত ছিলেন। কাদের বক্সের দৌহিত্র এবং আলহাজ হাফেজ মো. মুছার পুত্র তৎকালীন সংসদ সদস্য অধ্যাপক হামিদুর রহমান মসজিদটির বর্ধিত অংশ ১৯৬৮ সনে নির্মাণ করেন। এরপর মসজিদটি বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার সম্প্রসারণ করা হয়। কালের পরিক্রমায় এই মসজিদের কাঠামো বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। বংশ পরম্পরায় মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পান অধ্যাপক হামিদুর রহমানের ছেলে স্থানীয় সাংসদ ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। প্রতিমন্ত্রীর পরিবার ১৫০ বছর ধরে মসজিদটি দেখাশোনা করে আসছে। মসজিদটিকে সংস্কার করে প্রাচীন নবাবী ঐহিত্যের রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। তার উদ্যোগে এশিয়ার স্থপতিদের সংগঠন আর্ক এশিয়ার সভাপতি ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান স্থপতি আবু সাঈদ এম আহমেদের নেতৃত্বে মসজিদটি পুরনো ধাঁচে ফিরিয়ে আনতে সংস্কার কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালে এর সংস্কার কাজ শেষ হয়। পুরনো মসজিদটি এখন লাইব্রেরি এবং মক্তবে রূপান্তরিত হয়েছে।
ইউনেস্কোর এক বিবৃতি থেকে জানা যায়, যেসব স্থাপনা পুরস্কার পেয়েছে সেগুলোতে টেকসই উন্নয়নের নানা দিক রয়েছে। পুরনো স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণ ঠিকমতো হয়েছে কি না সেটি বিশ্লেষণ করে দেখে ইউনেস্কোর বিশেষজ্ঞ কমিটি। সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদটিকে পুরনো রূপ দেওয়া হয়েছে। এসব স্থাপনার মাধ্যমে ঐতিহ্যের যে বৈচিত্র্য ধরে রাখা হয়েছে সেটি সত্যিই প্রশংসনীয়।
সরেজমিনে মসজিদটিতে ঘুরে দেখা যায়, মসজিদের পুরোটাই চুন ও পাথরের তৈরি। মসজিদের ছাদ বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নির্মাণ করা হয়েছে। ছাদের নিচের কলামগুলো গাছের মতো তৈরী করা। দেখে মনে হয় ভাগ হয়ে যাওয়া ছাদের অংশকে নিচ থেকে গাছের মতো ধরে রাখা হয়েছে। মসজিদের ভেতরে বাতাস চলাচলের জন্য চারপাশ খোলা রাখা হয়েছে। যার কারণে মসজিদের ভেতরে দিনের বেলায় আলো ও বাতাস খেলা করে।
কোন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান ফারুক জানান, পুরনো এ মসজিদে একসঙ্গে দুই হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন।
ঢাকা-৩ আসনের সাংসদ ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সাংবাদিকদের বলেন, মসজিদটি যখন সংস্কারের কথা চলছিল তখন অধিকাংশ মানুষ এটাকে ভেঙে নতুন করে নির্মাণের কথা বলেছিলো। কিন্তু আমি সেটি করতে চাইনি। আমি প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রেখে মসজিদটি সংস্কার করতে চেয়েছি । তিনি আরও বলেন, আমরা যখন নতুনের কথা বলব তখন পুরনোকে সঙ্গে নিয়েই বলতে হবে। নতুন প্রজন্ম সেসব প্রাচীন ঐতিহ্য না দেখলে তারা বুঝতে পারবে না এই দেশ কেমন ছিল। তাই পুরনো ঐতিহ্যকে লালন করতে হবে।
উল্লেখ্য, ফিজি থেকে শুরু করে কাজাখস্তান পর্যন্ত এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোকে প্রতিবছর স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। স্বীকৃতি দেয়া এ পুরস্কারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাওয়ার্ডস ফর কালচারাল হেরিটেজ কনসারভেশন’। ২০২১ সালে ছয়টি দেশের ৯টি স্থাপনাকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘অ্যাওয়ার্ড অব মেরিট’ শ্রেণিতে স্বীকৃতি পেয়েছে কেরানীগঞ্জের দোলেশ্বর হানাফিয়া জামে মসজিদ। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন স্থাপনা এ বছর ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে।