কাগজের ভিতর লুকিয়ে আনা হলো সিগারেটের জাল স্ট্যাম্প,১৪৩ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা

জাহাঙ্গীর আলম ব্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম
চীন থেকে আর্ট পেপার ঘোষণায় আসা ২০ ফুট লম্বা এক কনটেইনারে সিগারেটের নকল ব্যান্ডরোল এনে ১৪৩ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির দেয়ার চেষ্টা করেছে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাপ্পু এন্টারপ্রাইজ। শুধু তাই নয়, নকল ব্যান্ডরোল আনা হয় কাগজ ঘোষণায়। তবে, তার ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস।

কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বাপ্পু এন্টারপ্রাইজ (BIN: 003245939-0503) চীন থেকে আর্ট পেপার ঘোষণায় পণ্য আমদানি করে।

পণ্যচালানটি খালাসের লক্ষ্যে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট মধুমতি অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড (AIN: 301801186) কাস্টম হাউস, চট্টগ্রামে গত ৯ ডিসেম্বর বিল অব এন্ট্রি (নম্বর: সি-১৯৯১৯২৪) দাখিল করে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের পোর্ট কন্ট্রোল ইউনিট (পিসিইউ) ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় রপতানিকারক, রফতানিকারকের ওয়েবসাইট, পণ্য তৈরির দেশ, আমদানিকারকের ব্যবসায়ের ধরন ও ঠিকানা, পণ্যের বর্ণনা প্রভৃতি বিশ্লেষণ করে পণ্যচালানটিতে অসত্য ঘোষণায় সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহারযোগ্য জাল স্ট্যাম্প থাকার বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা লাভ করে। পরবর্তীতে এ দফতরের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্স (এআইআর) টিম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে  পণ্যচালানের বিল অব এন্ট্রিটি লক করে। যাতে কেউ খালাস নিতে না পারে।

সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৪ ডিসেম্বর) পণ্যচালানের কনটেইনার নামিয়ে বন্দরের অভ্যন্তরে নিয়ম অনুযায়ী পণ্য পরীক্ষা শুরু করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর টিম। কনটেইনারের ২০টি প্যালেটের মধ্যে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ৫টি প্যালেট দেখানোর পর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট গড়িমসি শুরু করে এবং একপর্যায়ে কায়িক পরীক্ষা শেষ করার অনুরোধ করে। ওই ৫টি প্যালেটে শুধুই আর্ট পেপার পাওয়া যায়। কিন্তু এআইআর টিম শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করতে চাপ দিতে থাকে। এরপর এআইআর টিমের সদস্যরা আরেকটি প্যালেট খোলে এবং সিগারেটের জাল স্ট্যাম্প খুঁজে পায়।

অতঃপর এআইআর টিম কর্তৃক ২০টি প্যালেট শতভাগ কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন শেষে মোট ২৪৬ প্যাকেটে (প্রতি প্যাকেটে ২৬০ বান্ডিল এবং প্রতি বান্ডিলে ৫০০ পিস হিসেবে) ৩ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার পিস নিম্নস্তরের ১০ শলাকাবিশিষ্ট সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহারের উপযোগী হালকা খয়েরি রংয়ের জাল স্ট্যাম্প পাওয়া যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এস.আর.ও নং- ১৪৭-আইন/২০২০/১০৮-মূসক; তারিখ: ১১/০৬/২০২০ খ্রি. অনুযায়ী নিম্নস্তরের সিগারেট স্ট্যাম্প এর রং হালকা খয়েরি যার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৯ টাকা থেকে ৬২ টাকা এবং যার বিপরীতে এসডির হার ৫৭ শতাংশ এবং মূসকের হার ১৫ শতাংশ।

এই পণ্যচালানটি খালাস হয়ে গেলে এ স্ট্যাম্প ৩ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার নিম্নস্তরের সিগারেটের প্যাকেটে ব্যবহার করা যেত যার মাধ্যমে সরকার প্রায় ৯০ কোটি থেকে ১৪৩ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতো।

সূত্র জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এস.আর.ও নং: ১৮১-আইন/২০১৯/৩৮-মূসক তারিখ: ১৩ জুন, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ এর বিধি ১১ এর উপবিধি (৫) অনুযায়ী স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয় এবং বিধি (৬) অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কর্তৃক দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ এবং সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি প্রতি ৩ (তিন) মাস অন্তর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সিগারেট স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোল সরবরাহ ও ব্যবহার আড়াআড়ি যাচাইপূর্বক প্রতিবেদন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মূসক বাস্তবায়ন শাখায় পাঠাতে হয়। ফলে এই জাতীয় পণ্য দি সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা অথবা বিদেশ থেকে আমদানি করার কোনো সুযোগ নেই।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইভেস্টিগ্রেশন এন্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার ডেপুটি কমিশনার মোহাম্মদ শরফুদ্দিন আমার সময়কে বলেন, বড় জালিয়াতি করেছে আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান মিলে। একে তো মিথ্যা ঘোষণা তার উপর নকল ব্যান্ডরোল বা ট্যাক্স স্টাম্প আমদানি। দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে প্রচলিত অন্যান্য আইন ও বিধি অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।