করোনাকালীন শিশুদের স্কুল বন্ধ সময়ে প্রযুক্তি ব্যাবহারে চাই সচেতনতা -জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম

করোনাকালীন সময়গুলোতে শিশুরা নতুন বই পেলেও বেশি দিন স্কুলে যাবার সুযোগ হয়নি তাদের। করোনাভাইরাসের সংক্রামণ ঠেকাতে সরকার সবার আগে যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটি হচ্ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা। তারই ধারাবাহিকতায় করোনার শুরু থেকেই প্রায় কয়েক ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিলো।

দীর্ঘ দিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি তারা মানসিকভাবে ভালো নেই। আর এর সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশু শিক্ষার্থীদের উপর। কারণ, এ সময়টিতে পড়াশুনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা সামাজিকতাও শিখে। এক্ষেত্রে স্কুলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষক এবং অভিভাবকরা।

করোনাকালীন এই সময়গুলোতে প্রায় অধিকাংশ শিশুরা লেখাপড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর রয়েছে অনেক কারণ, শিশু সন্তানরা নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে যাওয়া,  সেখান থেকে ফিরে আসা এবং বাসায় পড়তে বসার বিষয়গুলো নিয়মিত রুটিনের মতো ছিল। তাই স্কুলে পড়ালেখা না হলে বাচ্চারা বাসায় পড়তে চায়না।

“এখন তাদের রুটিন বলতে আর কিছু নাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে শিক্ষার্থীদের বড় প্রত্যাশার জায়গা থাকে খেলাধুলা এবং বন্ধু মহল।

“অনেক শিশু প্রথমে স্কুলে যেতে চায়না। কিন্তু পরবর্তীতে সেখানে যখন তাদের বন্ধু তৈরি হয় তখন সে জায়গাটি তাদের জন্য আনন্দময় হয়ে উঠে।

যে বয়সটিতে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে, সে সময় তাদের সামাজিকতা শেখার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। স্কুলে বিভিন্ন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সাথে মেলামেশা, নানা ধরণের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের সমাজের সাথে পরিচিত হতে সাহায্য করে।

“স্কুলের মাঠ তাদের অতি প্রিয়। বিশেষ করে শিশু শিক্ষার্থীদের। খোলা বাতাসে ঘরের বাইরে আনন্দটা তারা মিস করে।

সর্বোপরি স্কুল শিশুদের আনন্দের জায়গা সেখানে শিক্ষার পাশাপাশি নতুন কিছু শিখবে। পড়ালেখা, খেলাধুলা,সামাজিকতা, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক নানা আয়োজন থাকে। স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুরা সেসব বিষয় থেকে বঞ্চিত।

(দুই)

ফলে তারা মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোর প্রতি। আধুনিক প্রযুক্তিবিদ্যার যুগে আমাদের সবার ঘরবাড়িতেই আজ স্মার্ট টেকনোলজিক্যাল ডিভাইস আছে। উন্নত মানের মোবাইল, পারসোনাল কম্পিউটার, টেলিভিশন, টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত গেমিং ডিভাইসসহ আরো অনেক গ্যাজেটই আমাদের ঘরবাড়িতে রয়েছে।

এ ছাড়া আজকাল কম বয়সি শিশুদের হাতে ইলেকট্রনিক ডিভাইস তুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে তারা এগুলোর প্রতি মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তাদের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। এ বিষয়ে আমরা যথাসময়ে সতর্ক না হলে আমাদের শিশুদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।শিশু-কিশোরদের মধ্যে অধিকমাত্রায় ভিডিও গেম বা ফেসবুকের মতো ভার্চুয়াল লাইফে সংশ্লিষ্টতার কারণে ধীরে ধীরে তা আসক্তিতে পরিণত হয়। নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিশ্বের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন শীর্ষ অবস্থায় এবং এ উন্নয়নের পরশে মানুষের জীবনযাত্রায় হয়েছে লক্ষণীয় পরিবর্তন; এনেছে গতি ও শৌখিনতা। কিন্তু এর অপব্যবহারে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদের ওপরও নানাভাবে এর কুপ্রভাব পড়ছে। উন্নত বিশ্বের শিশুদের মতো বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি আসক্তি বাড়ছে।

একটা সময় বিকাল হলেই খেলার মাঠগুলোতে ছোটাছুটিতে মেতে থাকত শিশু-কিশোররা। ফুটবল, ক্রিকেট, গোল্লাছুট, কাবাডি, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাঙ্গুলি, মারবেল, ক্যারম বোর্ডসহ নানা খেলায় বুদ হয়ে থাকত তারা। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডা দৌড়াদৌড়ি, দুষ্টুমিই ছিল তাদের নিত্যদিনের আনন্দ। সকাল-সন্ধ্যায় গল্পের বইয়ে ডুব দেওয়া, বড়দের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, প্রবীণদের কাছ থেকে গল্প সোনা ছিল তাদের কাছে একটা ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আজকে যেন সবই হারিয়ে যেতে বসেছে। এসব জয়গা এখন দখল করে নিয়েছে মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাব আর ল্যাপটপের মতো আধুনিক প্রযুক্তি।

উল্লেখ্য, শহর কিংবা গ্রাম এখন সব জায়গাতেই বাবা-মায়েরা সন্তানকে সময় দিতে পারেন না ব্যস্ততার কারণে। তাই শিশুদের সময় কাটে এখন টিভির কার্টুনে নয়তো মোবাইল ফোন, ট্যাব বা প্রযুক্তির নানা আরো পণ্য। আবার কিছু বাবা-মা তার চঞ্চল শিশুকে অন্য কোনো উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অগত্যা মোবাইল দিয়ে বসিয়ে দেন। আবার অনেক মা তার সন্তান খেতে না চাইলে মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেন। তারা ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে কার্টুন দেখতে দেখতে খাবার যায়। এভাবেই বাবা-মায়েরা সন্তানকে শান্ত রাখতে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোনসহ নানা ধরনের প্রযুক্তিপণ্য। এতে একদিকে যেমন বাবা-মায়েরা নিশ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি তারা এটাকে আভিজাত্যের অংশ মনে করেন। আবার অনেকেই আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন কারণ তার সন্তান ইন্টারনেট থেকে সব তথ্য, অ্যাপস ডাউনলোড করতে পারে এবং খুব ভালো গেমস দেখতে পারে। এখনকার শিশুরা প্রযুক্তিপণ্যে এতটাই আসক্ত যে, তাদের হাত থেকে মোবাইল ফোন বা ট্যাব কেড়ে নিলে তারা রেগে যায় এবং নেতিবাচক আচরণ করে। কার্টুন দেখতে দেখতে এবং গেমস খেলতে খেলতে শিশুদের

এমন অবস্থা হয়েছে যে, তারা অন্য কোনোদিকে খেয়াল করে না, কারো সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। তাদের ডাকলে তারা সহজে সাড়া দেয় না। তারা অন্য একটা জগতে থাকে। এখনকার শিশুরা সব কাজ করছে নেট ব্রাউজ করে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিশুর মেধার চর্চা। মাথা খাটিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ থেকে সরে যাচ্ছে তারা। সবকিছুর সমাধান তৈরি পাচ্ছে, ফলে তাকে কিছুই করতে হচ্ছে না। সব বাচ্চার ক্ষেত্রে এটা সত্যি নাও হতে পারে।

মনে রাখবেন আপনার শিশু যত বেশি আসক্ত হয়ে পড়বে, তত তাকে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। তাই করোনাকালীন এই ঘর বিন্দী সময়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখুন। পরিবারের প্রত্যেকে ওই সময় কম্পিউটার, মোবাইল বা অন্য যেকোনো ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহার থেকে দূরে থাকুন। এ সময়টা বরাদ্দ করুন বই পড়া, রান্না করা, ছবি আঁকা বা অন্য কোনো কাজের জন্য। একটা সময় বেঁধে প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস করুন। নিজে মেলে চলুন, সন্তানদেরও উৎসাহিত করুন। একটা গাইডলাইন তৈরি করুন। কতক্ষণ পড়াশোনা, কতক্ষণ গেমস খেলা, কতক্ষণ ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন, সবকিছুর। দেখবেন অকারণে প্রযুক্তির ব্যবহার কমে আসবে। এবং করোনাকালীন সময়ের প্রথামিক শিক্ষাটা যেনো পরিপূর্ণ ভাবে পরিবার থেকে পায় সে দিকে খেয়াল রাখা জরুরি।প্রযুক্তিপণ্য ও ফেসবুক সব সমস্যা নয়, কীভাবে এগুলো ব্যবহার করছি, সেটাই অন্যতম বিবেচ্য বিষয়। শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি আসক্তি দূর করতে জনসচেতনতা প্রয়োজন।

(তিন)

প্রাসঙ্গিক তবে ভিন্ন কিছু কথা দিয়ে লেখাটা শেষ করবো।নিশ্চয় আপনাদের মনে আছে? আর মনে থাকবেই না কেন। করোনা পরিস্থিতি পুরো দুনিয়ার সকল মানুষকে নানা ঘটনার সাক্ষি করে রেখেছে। এর মধ্যে যদি শিক্ষা ব্যাবস্থা নিয়ে কথা বলি তাহলে শুরুতে আসে ২০২০ সালে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই কিছু পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবতার নিরিখে বললে এর কোনো ভালো বিকল্প ছিল না। তবে যে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে তা হলো, প্রাথমিক বা নিম্ন মাধ্যমিক (এমনকি মাধ্যমিক) পর্যায় পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তনে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। চতুর্থ বা অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত কোনো শিক্ষার্থী কোনোরূপ পরীক্ষা ছাড়া উপরের শ্রেণিতে উঠে গেলে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশুনা করছে তাদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। পরীক্ষা ছাড়া উপরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবার সুযোগ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও  শিক্ষা পরবর্তী জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ুয়া কোনো শিক্ষার্থীর জন্য এ রকম কোনো বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, যে লেখাপড়ার সঙ্গে ব্যবহারিক বিষয় জড়িত সেসব ক্ষেত্রে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি বিবেচনা করতে হবে। করোনাকালে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের। এসব নিয়ে অনেক মজার ট্রল হচ্ছে। অনলাইনে ক্লাস করে মেডিক্যালের একজন শিক্ষার্থী পরে ডাক্তার হয়ে ফটোশপে বুকের হাড় জোড়া দেওয়া, কিংবা প্রকৌশলের শিক্ষার্থী হয়ে কাঁচের দেয়াল দিয়ে শৌচাগার নির্মাণ করা ইত্যাদি নিয়ে ‘নেট-দুনিয়া’ অনেক হাস্যরসের যোগান দিচ্ছে। বাস্তবতা কিন্তু এরকমই। যদি সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানে সঠিক পাঠদান না হয়, তবে আগামীর ভবিষ্যৎ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

 জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধাণ ‘দৈনিক আমার সময়।