কক্সবাজার কলাতলীর ঢালু সড়কে লেগে আছে দূর্ঘটনা, সমাধান খুঁজছে কর্তৃপক্ষ

দিদারুল আলম সিকদার, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ কক্সবাজার শহরের কলাতলী মোডে’র ঢালু সড়কে একের পর এক ঘটছে দূর্ঘটনা। বিভিন্ন সময় সড়ক দূর্ঘটনায় আইনজীবি, শ্রমিক নেতা, পর্যটক, শিক্ষার্থী সহ মারা গেছেন অনেক পথচারী। কলাতলী সড়কের ঢালু অংশ হয়ে নামার সময় নিয়ন্ত্রন হারিয়ে এসব দূর্ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে মাল বোঝাই ভারী গাড়ি (ট্রাক-পিকআপ-লরি) গুলোই বেশি এই দূর্ঘটনায় পতিত হয়। এ ব্যাপারে সড়কের কাঠামো, স্পিড ব্রেকার, চালককে পূর্ব সর্তক না করা, সড়কের দুই পাশ দখল, ছোট সড়ক সহ নানা অব্যবস্থাপনার কথা বলছেন সচেতন মহল।

এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর ও ট্রাফিক বিভাগ বলছেন নানা দিক নির্দেশনামূলক কথা। এদিকে ওই ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাব নেই।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, কলাতলী পয়েন্টে গত বছর ২০২১ সালের ৬ মার্চ শনিবার  রাত পৌনে ১১ টার দিকে সিমেন্টবোঝাই ট্রাক ফুটপাতে উঠে পড়ে। এসময় ট্রাকের চাপায় আইনজীবি, পর্যটকসক ৩ জন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ৯ জন। দুমড়েমুচড়ে ভাসমান দোকান, সিএনজি ও ইজিবাইক। এ ঘটনায় নিহতরা হলেন, কলাতলী দক্ষিণ আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা মোহমেনা বেগম (৬৫), ঢাকার উত্তরা থেকে ভ্রমণে আসা পর্যটক শাহাদাত হোসেন (৩৮) ও কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবি মো. ওসমান গণি (৫৫)। তারা সবাই পথচারী ছিলেন।

গত ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারী দুপুর ১২ টার দিকে একই সড়কের ঢালু জায়গায় ডাম্পারের ধাক্কায় নিহত হয় শ্রমিক নেতা খোরশেদ আলম (৩৫)। ডাম্পারটি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে তার মোটরসাইকেলে মেরে দিলে এই দূর্ঘটনা ঘটে। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিলেন।

গত বছর ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর মালবাহি বড় ট্রাক ওই ঢালু দিয়ে নামার সময় নিয়ন্ত্রন হারিয়ে একটি সিএনজি ও দুইটি অটোরিক্সকে মেরে দেয়। যদিও কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

গত শুক্রবার ৭ রাত সাড়ে ১০ টার দিকে কলাতলীতে বেপরোয়া ট্রাকের ধাক্কায় আশরাফ আশু (৩৫) নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়। নিহত যুবক ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের পশ্চিম লারপাড়ার সেনায়েত আলীর ছেলে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। ফলে সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

২০১৮ সালের দিকে ওই সড়কে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে যাত্রীছাউনি গুড়িয়ে দেয় একটি ট্রাক। যেখানে এক পথচারী মারা যায় এবং একজনের পা চলে যায়। এছাড়াও প্রায়’ই দূর্ঘটনা ঘটে কলাতলীর এই ঢালু সড়কে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে।

পর্যটন সমাগম স্থানের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে একের পর এক সড়ক দূর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এর কোন সঠিক তথ্য নেই এবং সেই তথ্যের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যবস্থা নেই। বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষের অবহেলা হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।

কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু জানান, ওই জায়গায় সড়ক দূর্ঘটনার বড় একটি কারণ হল সংকীর্ণ মোড়। যার ফল অনেক চালক মাল বোঝাই ট্রাক বা বড় গাড়িগুলো সহজে ঘুরাতে পারেনা। এতে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ঘটে দূর্ঘটনা। এছাড়া রাস্তার দুই পাশে ফুটপাত দখল হচ্ছে আরো একটি কারন। এমনিতে রাস্তা ছোট, তার মধ্যে দুই পাশে দখল করে থাকায় ঢালু সড়ক দিয়ে নামার সময় চালক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ব্রেক ফেল করে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। দূর্ঘটনায় একের পর এক মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমাধান করা উচিৎ ছিল। যা অনেক দেরি হয়ে গেছে।

কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্স এর সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা জানান, কিছু দিন আগে তাঁর গাড়িও ওই জায়গায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। সমাধান হিসেবে তিনি বলেন দূর্ঘটনা কমাতে গতানুগতিক স্পিড ব্রেকার ব্যবহার না করে আধুনিক মানের গতি নিয়ন্ত্রনের মাধ্যম ব্যবহার করলে ভাল হয়। এটি এখন সময়ের দাবী। এছাড়া ঢালু ওই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় আসার আগে চালককে সর্তক করতে মারকিং (চিহ্নিত) বা লাইট ব্যবহার করা উচিৎ।

এই প্রসঙ্গে স্পিড ব্রেকার নিয়ে ভিন্নমত পোষন করেন নিটা কম্পিউটার এন্ড টেকনোলজির স্বত্বাধিকারী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আলমগীর হোসাইন, তিনি বলেন ঢালু রাস্তা দিয়ে নামার সময় স্পিড ব্রেকার প্রযোজ্য হলেও গাড়ি উঠার সময় তা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তবে এই ঝুঁকিপূর্ন সড়কের ব্যাপারে চালককে অগ্রিম সর্তক করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আধুনিক কৌশল প্রয়োজন।

কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ সুপার এম.এম.রকীব উর রাজা জানান, কলাতলী মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ বক্স রয়েছে। যেখানে সবসময় ট্রাফিক দায়িত্বরত থাকেন। সড়ক দূর্ঘটনার প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি দুঃখ্যজনক। তিনি নিজেই গত বছর ২০২১ সালের ৬ মার্চ এর সড়ক দূর্ঘটায় হতাহতের সাক্ষী। ঘটনার পর পরই ওই সড়কের দুই পাশে থাকা সিএনজি (অটো রিক্সা) স্টেশন তুলে দেওয়া হয়েছে এবং ওই জায়গা সবসময় যানজট মুক্ত রাখা হয়।

তিনি আরো জানান, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মাল বোঝাই ভারী ট্রাক-পিকআপ-লরিগুলো সড়কের ঢালু অংশে ব্রেক ফেল করে দূর্ঘটনায় পতিত হয়। এই সমস্যার সমাধানে চালকে সামনে ঢালু রাস্তায় ঝুঁকির বিষয়টা অগ্রিম অবহিত করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে তিনি সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

কলাতলীর এই ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে গত ৫ বছরের বা এরও আগে সড়ক দূর্ঘটনায় কতজন মারা গেছে এই তথ্য নেই সিভিল সার্জন অফিসে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার সিভিল সার্জন অফিসার ডাঃ মোঃ মাহবুবুর রহমান জানান, ওই পয়েন্টে সড়ক দূর্ঘটনা এবং হতাহতের বিষয়টি তিনি অবগত। সার্বিকভাবে কতজন মারা গেছে তার কোন তথ্য নেই।

কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের নিবার্হী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তাফা জানান, মাল বোঝাই ভারী গাড়িগুলো অনেক সময় ঢালু সড়কে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। প্রকৃতপক্ষে সড়কটি প্রয়োজনের তুলনায় ছোট। যা ২০০ থেকে ২৫০ মিটারের বেশি নয়। দূর্ঘটনা কমাতে সড়কটি বড় করতে হবে। এছাড়া সড়ক থেকে ৩ চাকার গাড়িগুলো সরিয়ে ফেলা জরুরী হয়ে পড়েছে। এসবের কারণেই দূর্ঘটনা বেশি হয়।

স্পিড ব্রেকারের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্পিড ব্রেকার উন্নত দেশে নাই। সড়ক দূর্ঘটনা বন্ধে স্পিড ব্রেকার কখনো কোন সমাধান নয়। তবে এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত সময়ের মধ্যে সাইন সিগন্যাল সহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থ গ্রহণ করা হবে। যা আগামী দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে।