কক্সবাজারে কাল কউকের আধুনিক ভবন উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

দিদারুল আলম সিকদার, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ সরকারের মহাপরিকল্পনাকে ঘিরে ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করেছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক)। তবে সে সময় প্রতিষ্ঠানটির স্থায়ী কার্যালয় ছিল না। এ ছাড়া ছিল না স্থায়ী জনবল। প্লাস্টিকের ১টি টেবিল ও ২টি চেয়ার নিয়ে শুরু হয় অফিসিয়াল কাজ। কিন্তু নানা সংকট-সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে গত ৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটি তার ভিত্তি মজবুত করেছে।

আগামীকাল বুধবার (১৮ মে) ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১০ তলাবিশিষ্ট আধুনিক এ ভবনটি, গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ লক্ষে ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে।

সোমবার (১৬ মে) দুপুর ১২টায় কউক ভবনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফোরকান আহমদ বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পর থেকেই কক্সবাজারকে একটি আধুনিক-রুচিশীল পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীতায় সেভাবে এগোয়নি। এখন সেই সমস্যা কাটিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু হয়েছে।

কউক চেয়ারম্যান আরও বলেন, এতসবের মাঝেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আমার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে চলেছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস ভবন।

২০১৬ সালের ৬ জুলাই কক্সবাজারকে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য জাতীয় সংসদ কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল- ২০১৫ পাশ করা হয়। ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদকে নিয়োগ করে সরকার। এরপর ১৪ আগস্ট তিনি যোগদান করেন। টানা তিন মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

কউক সুত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ অনুষ্ঠিত ভূমি বরাদ্দ কমিটির সভায় কউকের অফিস ভবন নির্মানের জন্য ১.২১ একর জমি কউকের অনুকুলে বরাদ্দ প্রদান করা হয়। ১১২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দে ওই বছরের ৬ মে এটির ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই। এর মধ্যে ২০২০ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতিতে মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি আরও ২ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়। যা ২০২১ সালে এসে শেষ হয়েছে। কিন্তু ১১৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দে নির্মাণ কাজ শেষে বেচে যায় ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা। রীতিমতো সরকারের কাছে এই অর্থ ফেরতও দিয়েছে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। যা কক্সবাজারের ইতিহাসে বিরল।

ভবনটিতে যা রয়েছে-কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যমতে, ভবনটির একদম বেইজম্যান্ড গ্র্যাউন্ড ফ্লোর ২২ হাজার ২৫ স্কয়ার ফিট, গ্রাউন্ড ফ্লোর ১৬ হাজার স্কয়ার ফিট, প্রথম ফ্লোর ২০ হাজার ৮৮২ স্কয়ার ফিট, দ্বিতীয় ফ্লোর ১৬ হাজার ৭৭ স্কয়ার ফিট, তৃতীয় ফ্লোর ১৯ হাজার ৫৩১ স্কয়ার ফিটসহ সর্বমোট ১ লক্ষ ৯৩ হাজার ৮১ স্কয়ার ফিট। এর মধ্যে রয়েছে মাল্টিপারপাস হল, ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার সিস্টেম, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, রেস্ট হাউজ, ওয়াইজোন, রেস্টুরেন্ট সিসি ক্যামেরাসহ সবধরনের অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা।

ইতিপূর্বে শনিবার (১৪ মে) রাতে দৈনিক কক্সবাজারের মুখোমুখি হন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্ণেল (অব:) ফোরকান আহমদ।

আলাপকালে তিনি বলেন, ‘ভবনটির নির্মাণকালীন সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলী হয়েছেন। কিন্তু এতে নির্মাণ কাজের কোন জটিলতা সৃষ্টি হয়নি। তাছাড়া কাজের গুণগতমান এবং সকল কর্মকর্তারা আমাদের নজরদারিতে ছিলেন। এ কারণে কোন অনিয়ম ঘটেনি, টাকাও সাশ্রয় হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজেই ভিত্তিপ্রস্তর করে নিজেই উদ্বোধন করবেন এটিই আমার বড় প্রাপ্তি।’

লে. কর্নেল (অব:) ফোরকান আহমদ বলেন, ‘২০১৬ সালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের পর থেকেই কক্সবাজারকে একটি আধুনিক-রুচিশীল পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীতায় সেভাবে এগোয়নি। এখন সেই সমস্যা কাটিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু হয়েছে।’

ফোরকান আহমেদ বলেন, ‘কক্সবাজারে সমুদ্রসৈকতের ৭০.০৬ একর জায়গাকে সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা করে সেটিকেই মহাপরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে, যার গেজেটও হয়ে গেছে।

‘বিশাল এই সৈকতকে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করে আধুনিক করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। আর বাঁকখালী নদীর চার পাশ হাতিরঝিলের আাদলে তৈরি করা হবে। গড়ে তোলা হবে নতুন নতুন আধুনিক শহর।’

দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যাতে আনন্দময় সময় কাটাতে পারেন, সে জন্য উন্নত দেশের সৈকত এলাকায় যে যে সুবিধা আছে, তার সবই কক্সবাজারে রাখা হবে বলেও জানান কউক চেয়ারম্যান।

কউকের চেয়ারম্যান বলেন, এতো সবের মাঝে আমার বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে চলেছে। যেটি এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অফিস ভবন। এটি আগামী ১৮মে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা সব প্রস্তুতি শেষ করেছি। এ অনুষ্ঠানে এক হাজার অতিথি উপস্থিত থাকবেন।

তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে আড়াই শতাধিক জনবল দরকার সেখানে বর্তমানে আছে অর্ধ-শতাধিক। বাকিদের নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এখন অফিস ভবন হয়েছে। আগামীতে ‘দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য সরকারের কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে না; বরং আয় হবে। সরকার শুধু নিয়ন্ত্রণ করবে।’

এছাড়া কক্সবাজারের পরিকল্পিত উন্নয়নে নতুন করে আবারো ‘মাস্টার প্ল্যান’ তৈরীর কাজ শুরু করেছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু হওয়া ‘মাস্টার প্ল্যান’ তৈরীতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৪ কোটি টাকা। যা চুড়ান্ত করতে সময় লাগবে ২ বছর পর্যন্ত। এর মধ্যে ৬ মাস রাখা হয়েছে অভিযোগ শোনার জন্য। পরের ৬ মাস এসব অভিযোগের পর্যালোচনা শেষ করে চুড়ান্ত কাজের পরিধি নির্ধারণ করা হবে। প্ল্যানটি সরকার থেকে অনুমোদন নিয়ে গেজেট আকারে প্রকাশ হতে ৩ বছরের মত সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।

যদিও এর আগে ২০১৩ সালে কক্সবাজারের উন্নয়নে আরো একটি ‘মাস্টার প্ল্যান’ করা হয়েছিল। যা সরকার অনুমোদনও দিয়েছে। কক্সবাজার শহর ও সমুদ্র সৈকতের কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত এলাকা ঘীরে এই মাস্টার প্ল্যান তৈরী করে ছিল নগন উন্নয়ন অধিদপ্তর। ওই প্ল্যান্ট তৈরী করতে কত ব্যয় হয়েছে তা নিশ্চিত করতে পারেননি দায়িত্বশীল কোন প্রতিষ্ঠান।

তবে ২০১৩ সালে অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যানটি বাস্তব সম্মত নন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) ফোরকান আহমদ। তিনি বলেন,, যে বা যারা প্ল্যান্ট তৈরী করেছেন তারা কেউ মাঠ পর্যায়ে কাজ করেননি। সম্ভবত ঢাকায় বসে প্ল্যান করা হয়েছে। ফলে প্ল্যানে একটি ১০ ফিটের রাস্তা ১০০ ফিট করার পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে। যা করা সম্ভব নয়। ফলে নতুন করে মাস্টার প্ল্যান তৈরী করতে হচ্ছে।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, সেলটেক নামের একটি বেসরকারি সংস্থা ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত চেষ্টা করে তৈরী করে কক্সবাজার পর্যটন এলাকার মাস্টার প্ল্যানটি। কিন্তু এটি বাস্তবতার নিরিখে অনেক গরমিল দেখা গেছে।

প্ল্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কক্সবাজার পৌরসভার টেকপাড়ার উকিলপাড়া এলাকাটি একটি আবাসিক এলাকা হলেও এটিকে মাস্টারপ্ল্যানে দেখানো হয়েছে বাণিজ্যিক এলাকা বলে। আবার শহরের পাহাড়তলীর কচ্ছপিয়া পুকুরের পূর্ব এলাকাকে প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা বলে মাস্টারপ্ল্যানে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে একটি আবাসিক এলাকা।

কক্সবাজার সদর উপজেলার লাগোয়া উত্তর পাশের এলাকাটি একটি আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠেছে। সেটিকেও মাস্টারপ্ল্যানে প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও টেকনাফ কক্সবাজার সড়কের সংযোগস্থল লিংক রোড এলাকাটি একটি বাণিজ্যিক এলাকা হলেও সেটিকে মাস্টার প্ল্যানে উল্লেখ করা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা হিসেবে। এসব কারণে নতুন করে মাস্টার প্ল্যান করা জরুরী বলে মনে করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।